Hindu Temple Non Veg Food: কামাখ্যা, তারাপীঠ, কালীঘাট থেকে কাল ভৈরব—ভারতের কোন কোন মন্দিরে মাছ, মাংস বা মদ নিবেদনের রীতি রয়েছে? জানুন ধর্মীয় ঐতিহ্যের চমকপ্রদ তথ্য। বৈষ্ণবদের আরাধ্য জগন্নাথ মন্দিরেও এক দেবীর প্রসাদের নিয়ম পুরো আলাদা।
দুর্গাপুজোর আগে মাংস বিক্রি নিয়ে বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের পর ফের সামনে এসেছে খাদ্য ও ধর্মীয় রীতির বিতর্ক। বাগেশ্বর বাবা পুজোর সময় বাঙালিদের আমিষ ভোজনের রীতিমত সমালোচনা করেন। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মন্দিরের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, দেবদেবীর উদ্দেশে নিবেদিত খাবারের রীতি সর্বত্র এক নয়। কোথাও নিরামিষ ভোগই প্রধান, আবার কোথাও মাছ, মাংস বা মদ নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচারের অংশ। এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। ভারতের হিন্দু উপাসনা বহু শাখা-প্রশাখায় বিকশিত হয়েছে। শাক্ত, তান্ত্রিক, বৈষ্ণব এবং বিভিন্ন লোকধর্মীয় ধারার নিজস্ব আচার রয়েছে। তাই একটিমাত্র খাদ্য-রীতিকে গোটা হিন্দু ধর্মের সর্বজনীন নিয়ম হিসেবে দেখা যায় না।
কামাখ্যা মন্দিরে পশুবলির প্রাচীন রীতি

অসমের কামাখ্যা মন্দির ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠ। এখানে নির্দিষ্ট শাক্ত ও তান্ত্রিক আচারে পশু উৎসর্গের প্রথা রয়েছে। ছাগ বলি বিশেষ কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
কামাখ্যা মূলত শাক্ত ও তান্ত্রিক সাধনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রচলিত দেবীমূর্তির পরিবর্তে এখানে দেবীর যোনিরূপের উপাসনা করা হয়। অসম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের শক্তি আরাধনার দীর্ঘ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এই মন্দির।
তারাপীঠে মা তারার ভোগে মাছ-মাংস!
বীরভূমের তারাপীঠ শুধু বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় তীর্থ নয়, শাক্ত ও তান্ত্রিক সাধনারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মা তারাকে নির্দিষ্ট রীতিতে মাছ ও ছাগের মাংস নিবেদনের প্রচলন রয়েছে। নিত্য পুজো থেকে বিশেষ পুজো আমিষ ভোগেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিছু তান্ত্রিক আচারে মদ ব্যবহারের কথাও ধর্মীয় ঐতিহ্যে পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
তারাপীঠের ধর্মীয় সংস্কৃতি বাংলার শাক্ত সাধনা, তন্ত্র এবং লোকবিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সাধক বামাক্ষ্যাপার মতো সাধকদের সঙ্গে এই তীর্থের নাম জড়িয়ে রয়েছে। ফলে তারাপীঠের খাদ্য ও পূজার রীতিও বাংলার নিজস্ব শাক্ত ঐতিহ্যের অংশ।
কালীঘাটে বলির রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস

কলকাতার কালীঘাট মন্দিরে দেবী কালীর আরাধনায় নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে পশু উৎসর্গের প্রথা ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত। ছাগ বলির পর মাংস রান্না করে বিতরণের রীতিও প্রচলিত রয়েছে। নিত্য পুজোতেও দেওয়া হয় মাছের রকমারি পদ। তবে একই মন্দিরে নিরামিষ নিবেদনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
কালীঘাট বাংলার অন্যতম প্রধান শক্তিপীঠ এবং কলকাতার ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার শাক্ত উপাসনার নানা রীতি এখানে বিকশিত হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ধরনের নিবেদনের উপস্থিতি সেই বৈচিত্র্যই তুলে ধরে।
দক্ষিণেশ্বরে মাছের ভোগ, কিন্তু নেই পশুবলি

দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির, কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে অতোপ্রতোভাবে যুক্ত। দেবী ভবতারিণীর ভোগের সঙ্গে মাছের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক রয়েছে। তবে বাংলার কিছু অন্য কালী মন্দিরের মতো এখানে পশুবলি দেওয়া হয় না। অর্থাৎ একই দেবী-উপাসনার ক্ষেত্রেও জায়গাভেদে খাদ্য ও আচার বদলে যেতে পারে। কথিত রয়েছে মন্দিরের পুজারী শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেবও আমিষ খাবার বর্জন করতে বলেননি।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
রানি রাসমণি ১৯ শতকে দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সাধনাস্থল হিসেবে এই মন্দিরের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। বাংলার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে দক্ষিণেশ্বরের বিশেষ স্থান রয়েছে।
পুরীর মন্দিরে বৈষ্ণব পরিবেশের মধ্যেই শাক্ত রীতি

ওড়িশার পুরী মানেই সাধারণত জগন্নাথদেবের বৈষ্ণব ঐতিহ্য। বৈষ্ণব রীতিতেই পুজো হয় জগন্নাথ, শুভদ্রা আর বরভদ্রের। নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয় এই তিন দেবতাকে। কিন্তু একই মন্দির চত্বরে রয়েছে মা বিমলার মন্দির। গুরুত্বপূর্ণ শাক্ত উপাসনা হয় এখানে। নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দেবী বিমলার উদ্দেশে মাছ ও ছাগের মাংস নিবেদনের ঐতিহ্য রয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
বিমলা মন্দির দেখায়, একই তীর্থক্ষেত্রে বৈষ্ণব ও শাক্ত ধর্মীয় ঐতিহ্য কীভাবে পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে। দুর্গাপুজোর সময় বিমলার উপাসনায় শাক্ত রীতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পুরীর ধর্মীয় ইতিহাসে এই সমন্বয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কেরলের এই মন্দিরে শুকনো মাছ ও তাড়িও নিবেদন!

উত্তর কেরলের পারাসিনিক্কাদাভু মুথাপ্পন মন্দিরের রীতি অনেক প্রচলিত মন্দিরের থেকে একেবারেই আলাদা। এখানে মুথাপ্পন দেবতার উদ্দেশে শুকনো মাছ (শুঁটকি মাছ)এবং তাড়ি নিবেদনের ঐতিহ্য রয়েছে। স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ধর্মীয় আচারের কী গভীর যোগ থাকতে পারে, এই মন্দির তার বড় উদাহরণ।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
মুথাপ্পন উপাসনা উত্তর কেরলের লোকধর্ম ও থেয়্যম সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই উপাসনা মূলধারার মন্দির-রীতির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, জীবনযাপন ও খাদ্যসংস্কৃতির প্রভাবও বহন করে।
মন্দিরের প্রসাদে চিকেন-মাটন বিরিয়ানি!

তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ের কাছে মুনিয়ান্দি স্বামী মন্দিরের বার্ষিক উৎসবে তৈরি হয় বিপুল পরিমাণ চিকেন ও মাটন বিরিয়ানি। উৎসবে অংশ নেওয়া ভক্তদের মধ্যে এই খাবার বিতরণ করা হয়। ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে স্থানীয় খাবারের এমন সরাসরি যোগ নজর কাড়ে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
মুনিয়ান্দি কোনও সর্বভারতীয় প্রধান দেবতা নন; তিনি মূলত তামিলনাড়ুর গ্রামীণ লোকদেবতা। তাঁর উপাসনার সঙ্গে স্থানীয় গ্রামজীবন, সম্প্রদায়গত উৎসব ও খাদ্যসংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বিরিয়ানি বিতরণের এই রীতি স্থানীয় লোকধর্মের চরিত্রকে তুলে ধরে।
উজ্জয়িনীর কাল ভৈরবকে নিবেদন করা হয় মদ

মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীর কাল ভৈরব মন্দিরের অন্যতম আলোচিত রীতি হল দেবতার উদ্দেশে মদ নিবেদন। ভক্তরা মন্দিরে মদ কিনে তা পূজার অংশ হিসেবে অর্পণ করেন। প্রচলিত নিরামিষ ভোগের ধারণার তুলনায় এই রীতি নিঃসন্দেহে আলাদা।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
কাল ভৈরবকে শিবের এক উগ্র রূপ হিসেবে মানা হয়। ভৈরব উপাসনার সঙ্গে ভারতের কিছু তান্ত্রিক ধারার ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। উজ্জয়িনীর এই মন্দির সেই বিশেষ ধর্মীয় ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচিত নিদর্শন।
আমিষ নিবেদন কি হিন্দু ধর্মে সর্বজনীন? ইতিহাস কী বলছে?

কামাখ্যা থেকে তারাপীঠ, কালীঘাট থেকে বিমলা—ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় কেন্দ্রে খাদ্য নিবেদনের রীতিতে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও নিরামিষ ভোগ, কোথাও মাছ-মাংস, আবার কোথাও বিশেষ ধর্মীয় আচারে মদও ব্যবহৃত হয়। তাই আমিষ নিবেদনকে যেমন গোটা হিন্দু ধর্মের নিয়ম বলা যায় না, তেমনই নিরামিষকেই সব মন্দিরের একমাত্র ঐতিহ্য বলা যায় না।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
হিন্দু ধর্মীয় পরম্পরা কোনও একক আচারব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। বৈদিক, শাক্ত, তান্ত্রিক, বৈষ্ণব এবং আঞ্চলিক লোকধর্মের দীর্ঘ বিবর্তনের ফলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা আলাদা উপাসনা-পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। খাদ্য নিবেদনের বৈচিত্র্য সেই দীর্ঘ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরই প্রতিফলন।
