পূর্ব লাদাখে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অচলাবস্থার অবসানে ভারত ও চিনের মধ্যে চুক্তির এক বছরেরও বেশি সময় পর জম্মু ও কাশ্মীরের শাকসগাম উপত্যকা নিয়ে নতুন করে সীমান্ত সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পূর্ব লাদাখে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অচলাবস্থার অবসানে ভারত ও চিনের মধ্যে চুক্তির এক বছরেরও বেশি সময় পর জম্মু ও কাশ্মীরের শাকসগাম উপত্যকা নিয়ে নতুন করে সীমান্ত সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শাকসগাম উপত্যকা নিয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে সাম্প্রতিক তীব্র বাদানুবাদ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৫,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাটিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। দিল্লি আগেই জানিয়েছে যে, ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান অবৈধভাবে চিনকে এই এলাকাটি হস্তান্তর করেছিল। চিন ইতিমধ্যেই চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) অংশ হিসেবে উপত্যকাটিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো নির্মাণ করছে।
পূর্ব কারাকোরাম পর্বতমালায় সিয়াচেন হিমবাহের কাছে অবস্থিত শাকসগাম উপত্যকা, যা ট্রান্স কারাকোরাম ট্র্যাক্ট নামেও পরিচিত। এর উত্তরে চিনের জিনজিয়াং অঞ্চল এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে) রয়েছে। যে বিষয়টি ভারতকে সতর্ক করে তুলেছে, তা হল উপত্যকায় চিনের একটি অল-ওয়েদার রাস্তা নির্মাণ। প্রায় ১০ মিটার চওড়া এই সড়কটির প্রায় ৭৫ কিলোমিটার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে যে এই অঞ্চলটি ভারতীয় ভূখণ্ডের অংশ এবং স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। মন্ত্রক আরও উল্লেখ করেছে যে, ভারত কখনও ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে চিনের স্বাক্ষরিত চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি, যে চুক্তির মাধ্যমে ইসলামাবাদ কর্তৃক অবৈধভাবে দখলকৃত এলাকা থেকে শাকসগাম উপত্যকার ৫,১৮০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা বেজিংকে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে, চিন ভারতের আপত্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে যে, তাদের নির্মাণকাজ ন্যায়সঙ্গত। চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মাও নিং বলেছেন, ওই এলাকাটি চিনের এবং সেখানে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার বেজিংয়ের রয়েছে।
এই পদক্ষেপ কাশ্মীরের অবস্থান নিয়ে চিনের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছে। কারণ, তারা এতদিন বলে এসেছে কাশ্মীর হল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধানযোগ্য একটি বিরোধ। অথচ, একই সময়ে পাকিস্তানের অবৈধ দখলে থাকা কাশ্মীরের এলাকাগুলোতে কৌশলগত উন্নয়ন চালিয়ে সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে বেজিং।
শাকসগাম উপত্যকা কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভারতের জন্য শাকসগাম উপত্যকা দুটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ— আঞ্চলিক এবং সামরিক। উপত্যকাটি বিশ্বের সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্র সিয়াচেন হিমবাহের কাছে অবস্থিত। এছাড়াও, এটি কারাকোরাম গিরিপথে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। সিয়াচেন থেকে পাকিস্তানের ওপর সরাসরি নজর রাখতে পারে ভারতীয় সেনা। আবার কারাকোরাম গিরিপথ থেকে চিনা কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে পারা যায়। সুতরাং, শাকসগাম উপত্যকায় নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবের সরাসরি প্রভাব পড়বে চিনের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) এবং পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) বরাবর ভারতের সামরিক অবস্থানের উপর। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে চিন ৪,৮০৫ মিটার উঁচু আগিল গিরিপথ পেরিয়ে নিম্ন শাকসগাম উপত্যকায় একটি রাস্তা তৈরি করেছে। যার ফলে ভারতীয় নিয়ন্ত্রিত সিয়াচেন হিমবাহের ইন্দিরা কলের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসবে চিন সেনা। কল হল একটি পর্বতমালার সর্বনিম্ন বিন্দু। গত কয়েক দশক ধরে ভারত প্রধানত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিয়াচেন অঞ্চলকে রক্ষা করার উপর মনোযোগ দিয়েছে, যেখানে হুমকিটি মূলত দক্ষিণের দিক থেকে ছিল। এখন এই নতুন রাস্তার কারণে উত্তর দিক থেকে চাপ বাড়াতে পারবে চিন। যা বিশ্বের সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্রে দুই-মুখী সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে।

