ডিজিটাল অ্যারেস্ট স্ক্যামের মাধ্যমে প্রতারকরা ভুয়ো পুলিশ, নকল আদালত এবং RBI অ্যাকাউন্টের ভয় দেখিয়ে এক বয়স্ক NRI দম্পতির কাছ থেকে ১৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দিল্লি পুলিশ এই ঘটনায় আন্তঃরাজ্য এবং আন্তর্জাতিক সাইবার নেটওয়ার্কের পর্দাফাঁস করেছে। 

NRI দম্পতির সাইবার জালিয়াতি: আজকের ডিজিটাল যুগে প্রতারকরাও অপরাধ করার জন্য হাই-টেক পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। ডিজিটাল অ্যারেস্ট স্ক্যাম এমনই এক নতুন এবং বিপজ্জনক সাইবার জালিয়াতি, যেখানে হাতকড়া বা পুলিশ স্টেশন থাকে না, তবুও শিকার পুরোপুরি ভয় ও চাপের মধ্যে চলে আসে। দিল্লির গ্রেটার কৈলাশ এলাকার এক বয়স্ক NRI দম্পতির সঙ্গে ঠিক এটাই ঘটেছে, যেখানে প্রতারকরা নিজেদের পুলিশ, তদন্তকারী সংস্থা এবং আদালত পরিচয় দিয়ে ১৪ কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিয়েছে। এই ঘটনাটি আরও ভয়ঙ্কর কারণ এতে কোনো লিঙ্কে ক্লিক করানো হয়নি বা OTP চাওয়া হয়নি—শুধুমাত্র ভয়, বিশ্বাস এবং আইনের নামে খেলা হয়েছে।

ডিজিটাল অ্যারেস্ট স্ক্যাম আসলে কী?

ডিজিটাল অ্যারেস্ট স্ক্যামে প্রতারকরা ফোন বা ভিডিও কলের মাধ্যমে নিজেদের পুলিশ, CBI, ED বা অন্য কোনো সংস্থার আধিকারিক বলে পরিচয় দেয়। শিকারকে বলা হয় যে সে কোনো মানি লন্ডারিং বা সিম কার্ড জালিয়াতির মামলায় ফেঁসে গেছে এবং এখন তাকে “ডিজিটাল নজরদারিতে” রাখা হচ্ছে। এর মানে হলো—ফোন চালু রাখতে হবে, ভিডিও কলে থাকতে হবে এবং কারও সঙ্গে কথা বলা যাবে না।

বয়স্ক NRI মহিলাকে কীভাবে ফাঁসানো হলো?

ডিসেম্বরে ৭৭ বছর বয়সী এক মহিলার কাছে একটি ফোন আসে। ফোন করে বলা হয় যে তার নামের সিম কার্ড মানি লন্ডারিংয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। ভয়টা এখান থেকেই শুরু হয়। এরপর ভিডিও কলে ভুয়ো পুলিশ অফিসার, নকল তদন্তকারী আধিকারিক এবং এমনকি আদালতের মতো পরিবেশও দেখানো হয়। মহিলা এবং তার স্বামী ভাবেন যে मामलाটি সত্যিই গুরুতর এবং যদি বিষয়টি বাইরে জানাজানি হয়, তবে গ্রেফতার নিশ্চিত।

“RBI বাধ্যতামূলক অ্যাকাউন্ট” কী ছিল সবচেয়ে বড় ফাঁদ?

প্রতারকরা বলে যে তদন্ত চলাকালীন টাকা “সুরক্ষিত রাখতে” তাদের একটি RBI-বাধ্যতামূলক অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করতে হবে। ভয়ের পরিবেশে ওই দম্পতি তাদের ফিক্সড ডিপোজিট, সেভিংস এবং বিনিয়োগ থেকে একে একে টাকা ট্রান্সফার করে দেন। মোট পরিমাণ—১৪ কোটি ৮০ লক্ষ টাকারও বেশি।

প্রতারণায় কারা জড়িত ছিল?

দিল্লি পুলিশের তদন্তে জানা গেছে যে এটি কোনো একজন ব্যক্তির কাজ নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ সাইবার নেটওয়ার্ক। এতে জড়িত ছিল—

  • NGO পরিচালক
  • আইটি ডিপ্লোমাধারী
  • ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রফেশনাল
  • একজন পুরোহিত
  • MBA গ্র্যাজুয়েট

তাদের কাজ ছিল মিউল অ্যাকাউন্ট সরবরাহ করা, অর্থাৎ এমন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যেখানে প্রতারণার টাকা লেনদেন করা হয়।

কম্বোডিয়া ও নেপালের সঙ্গে কী যোগসূত্র?

তদন্তে জানা গেছে যে আসল মাস্টারমাইন্ড ভারতে নয়, বরং কম্বোডিয়া এবং নেপাল থেকে এই চক্রটি চালাচ্ছিল। ভারতে ধৃত ব্যক্তিরা শুধুমাত্র টাকা ট্রান্সফার করানো এবং অ্যাকাউন্ট পরিচালনার কাজ করত।

দিল্লি পুলিশ কীভাবে পুরো নেটওয়ার্কটি ধরল?

১০ জানুয়ারি ই-পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা হয়। এরপর বিশেষ তদন্তকারী দল ব্যাংক লেনদেন ট্র্যাক করে, মোবাইল কল ডেটা বিশ্লেষণ করে এবং টেকনিক্যাল নজরদারি চালায়। তিনটি রাজ্যে অভিযান চালিয়ে ৮ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয় এবং বেশ কিছু মোবাইল ও চেকবুক উদ্ধার করা হয়।

এ থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কোনো পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থা ভিডিও কলে গ্রেফতার করে না, RBI কখনও টাকা ট্রান্সফার করতে বলে না এবং যদি ভয় দেখিয়ে টাকা চাওয়া হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হন। ডিজিটাল অ্যারেস্ট স্ক্যাম আজ সব বয়সের মানুষের জন্য বিপদ, তবে বয়স্ক এবং NRI-রা সবচেয়ে সহজ নিশানা হচ্ছেন।