গত কয়েক দিন ধরে প্রায় গোটা বিশ্বেই আলোচ্য বিষয় 'হাউডি মোদী'। আমেরিকায় 'হাউ ডু ইউ ডু' অর্থাৎ 'কেমন আছেন' কথাটিকে সংক্ষেপে 'হাউডি' বলা হয়। রবিবার এই মঞ্চে তাঁর বক্তৃতা শুরুতে মোদী বলেন দেশের মানুষকে নিয়েই মোদী। তাই তাঁকে হাউডি প্রশ্ন করার অর্থ, ইন্দো মার্কিনরা জানতে চাইছেন, ভারত কেমন আছে। তার জবাব হল ভারতে 'অল ইজ ওয়েল' অর্থাৎ সব ঠিকঠাক যাচ্ছে। কিন্তু, সত্যিই কি তাই? না কি প্রবাসী ভারতীয়দের স্রেফ ফাঁকা বুলিতে ভোলালেন মোদী? একবার অঙ্ক মিলিয়ে দেখে নেওয়া যাক।

গত ছয় বছরে সবচেয়ে বেহাল অর্থনীতি

মনমোহন সরকারের আমলে পর পর দুই বছর জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ শতাংশের নিচে। কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর অনেকটাই বেড়েছিল। বর্তমানে ফের ৫-এ নেমে এসেছে জিডিপির বৃদ্ধি।

গত ৪৫ বছরের মধ্যে বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি

২০১৯-এর লোকসবা নির্বাচনের আগেই বেকারত্ব নিয়ে শিহরণ জাগানো তথ্য ফাঁস হয়েছিল। সেই সময় মোদী সরকার অবশ্য তাকে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তারপর কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রক থেকে প্রকাশিত তথ্যেই দেখা গিয়েছে বর্তমানে ভারতে গত ৪৫ বছরের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। শ্রম মন্ত্রকের ওই তথ্য অনুযায়ী শহরাঞ্চলের কর্মক্ষম যুবদের মধ্যে ৭.৮ শতাংশই কর্মহীন। আর গ্রামাঞ্চলে এই হিসেবটা ৫.৩ শতাংশে দাঁড়িয়ে। সব মিলিয়ে ২০১৭-১৮'তে ভারতে বেকারত্বের হার ছিল ৬.১ শতাংশ।

১৫ বছরে সবচেয়ে কম বেসরকারি বিনিয়োগ

ভারতের অর্থনীতির মন্থরতার অন্যতম কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা দায়ী করছেন বেসরকারি লগ্নির অভাবকে। চলতি আর্থিক বছরের বাজেটের আগে সিএমআইই এই সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে চলতি বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে বেসরকারি লগ্নির পরিমাণ গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। জুন মাসে শেষ হওয়ার কোয়ার্টারে নতুন লগ্নি হয়েছে মাত্র ৪৩,৪০০ কোটি টাকার। যা ২০১৯ সালের প্রথম কোয়ার্টারের লগ্নির পরিমাণের থেকে ৮১ শতাংশ কম, আর গত বছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টারের থেকে ৮৭ শতাংশ কম।

কমছে ক্রয়ক্ষমতা, আয়

কেন্দ্রীয় পরিসংখ্য়ান অপিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী 'প্রাইভেট কনসামসন এক্সপেনডিচার' অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ব্যয়ের পরিমাণ চলতি বছরের জুন কোয়ার্টারে গত ১৮টি কোয়ার্টারের মধ্য়ে সবচেয়ে কম। আর এই ব্যায়ের পরিমাণ আম আদমির আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অনেক অর্থনীতিবিদই বলছেন, একই সঙ্গে বিমুদ্রাকরণ ও জিএসটি চালুর প্রভাব পড়েছে এই ক্ষেত্রে। বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, এবং তার ফলে তাদের হাতে এখন অর্থের অভাব। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমলে তার সরাসরি আঘাত করে পন্য উৎপাদন ক্ষেত্রে।

খুচরো বাজারে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি

ক্রয়ক্ষমতা কমার সঙ্গে সঙ্গে গোদের উপর বিষফোরার মতো ক্রমেই বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতির অস্বস্তি। হোলসেল দামের সূচক সেভাবে অর্থনীতির উপর প্রবাব না ফেললেও খুচরো ব্যবসার ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি গত অগাস্ট মাসে ছিল ৩.২১ শতাংশ, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। খুচরো ব্যবসায় মুদ্রাস্ফীতি মানে সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়া।

পরিকাঠামোগত প্রকল্পে বিলম্ব

সুযোগ পেলেই মোদী সরকারের মন্ত্রীরা উন্নয়ন নিয়ে বড়াই করে থাকেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারেরই পরিসংখ্যান ও প্রকল্প রূপায়ন মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য বলছে তাদের নজরদারিতে থাকা ১৬২৩টি প্রকল্পের মধ্যে ৪৯৬টি ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ের থেকে অবেক বেশি সময় লাগছে। আর তার প্রভাবে ৩৬১টি প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বরাদ্দ অর্থের থেকে বেশি অর্থের প্রয়োজন পড়ছে। ২০১৯-এর মে মাস পর্যন্ত এই কারণে সরকারি কোষাগার থেকে বাড়তি ৮,৯১,৫১২.৯১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। যা নির্ধারিত বাজেটের ৩৮.৭২ শতাংশ।

কিন্তু এরপরেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর 'অল ইজ ওয়েল'-ই মেনে চলতে হবে। কারণ এই সমস্তই অঙ্কের হিসেব। আর মোদী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পীযুষ গয়াল সপ্তাহ খানেক আগেই বলে দিয়েছেন, অঙ্ক কষে লাভ নেই। তা তাঁদের সরকারি মন্ত্রকের দেওয়া হিসেব হলেও।