উত্তরপ্রদেশের বিজনোর জেলার নাহতৌর শহর থেকে এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যা সম্পর্ক, ঐতিহ্য এবং আইনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ২৫ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া এক ব্যক্তিকে হঠাৎ জীবিত অবস্থায় পাওয়া গেছে, কিন্তু তাঁর এই ফিরে আসা পরিবারটির জন্য এক গুরুতর মানসিক ও সামাজিক সঙ্কট তৈরি করেছে।

উত্তরপ্রদেশের বিজনোর জেলার নাহতৌর শহর থেকে এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যা সম্পর্ক, ঐতিহ্য এবং আইনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ২৫ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া এক ব্যক্তিকে হঠাৎ জীবিত অবস্থায় পাওয়া গেছে, কিন্তু তাঁর এই ফিরে আসা পরিবারটির জন্য এক গুরুতর মানসিক ও সামাজিক সঙ্কট তৈরি করেছে। পাঞ্জাবের কাপুরথালা জেলার শিবদয়াল ওয়ালা গ্রামের বাসিন্দা হানসা সিং প্রায় ২৫ বছর আগে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। পরিবার তাঁকে সব জায়গায় খুঁজেছিল, কিন্তু তাঁর কোনও চিহ্ন পায়নি। তিন বছর অপেক্ষা করার পর পরিবার তাঁকে মৃত বলে ধরে নিয়েছিল। সামাজিক প্রথা অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রী বিমলা দেবীর বিয়ে হয় ছোট ভাই সুখা সিংয়ের সঙ্গে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিমলা দেবী তাঁর নতুন জীবনকে মেনে নেন। তিনি গত ২২ বছর ধরে সুখা সিংয়ের সঙ্গে বসবাস করে আসছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁদের তিনটি সন্তান হয় এবং পরিবারটি একটি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিল। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু একটি আকস্মিক ঘটনা পুরো পরিবারের জীবন বদলে দেয়।

কয়েকদিন আগে ছেঁড়া জামাকাপড় ও লম্বা দাড়িওয়ালা এক মধ্যবয়সী ব্যক্তিকে নাহতৌরের নয়া বাজারে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে দেখা যায়। তাঁর অবস্থা দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয় এবং তাঁরা পুলিশকে খবর দেন। স্টেশন হাউস অফিসার রবীন্দ্র প্রতাপ সিং ঘটনাস্থলে পৌঁছে লোকটির সঙ্গে কথা বলেন। প্রথমে লোকটি তাঁর পরিচয় স্পষ্টভাবে বলতে পারছিলেন না, কিন্তু ধীরে ধীরে ভাঙা ভাঙা ভাষায় তিনি তাঁর নাম হানসা সিং এবং পাঞ্জাবে বাড়ির কথা জানান। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেয় এবং তদন্ত শুরু করে। প্রযুক্তি এবং স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। গুগল সার্চ এবং পাঞ্জাবি ভাষা জানা ব্যক্তিদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর পাঞ্জাব পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পরিবারে আবেগঘন ঝড়

মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হানসা সিংয়ের পরিবার নাহতৌরে এসে পৌঁছয়। প্রথমে তাঁকে শনাক্ত করা কঠিন ছিল, কারণ ২৫ বছর কেটে গিয়েছিল এবং হানসা সিংয়ের শারীরিক অবস্থাও বদলে গিয়েছিল। কিন্তু যখন তিনি তাঁর শৈশবের ঘটনা এবং পারিবারিক গল্প বলতে শুরু করেন, তখন তাঁর ভাই এবং গ্রামের প্রধান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, তাঁদের চোখে জল এসে যায়।

এই মুহূর্তটি পরিবারের জন্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। ২৫ বছর পর পরিবারের হারানো সদস্যকে ফিরে পাওয়া অলৌকিকের চেয়ে কম কিছু ছিল না। কিন্তু এই আনন্দ একটি বড় দ্বিধাও নিয়ে আসে। বিমলা দেবী এক বিরাট দ্বিধার সম্মুখীন। এখন তিনি কোন সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেবেন, সেই প্রশ্নের মুখোমুখি। একদিকে আছেন তাঁর প্রথম স্বামী, হানসা সিং, যিনি ২৫ বছর পর ফিরে এসেছেন। অন্যদিকে আছেন তাঁর বর্তমান স্বামী, সুখা সিং, যার সঙ্গে তিনি ২২ বছর কাটিয়েছেন এবং যাঁর সঙ্গে তাঁর তিনটি সন্তান রয়েছে। মৃত বলে ধরে নেওয়া এবং দেওরের সঙ্গে বিবাহিত—এই পরিস্থিতিটি কেবল আবেগগতভাবেই জটিল নয়, সামাজিকভাবে এবং আইনগতভাবেও জটিল। এই ধরনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্য, আইন এবং মানবিক আবেগ—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

এই সিদ্ধান্তটি পরিবারের জন্য সহজ নয়

এই পুরো ঘটনায় নাহতৌর পুলিশের ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। পুলিশ সেই ব্যক্তির প্রতি সংবেদনশীলতা দেখিয়েছে, যাকে প্রথমে ভিক্ষুক বলে মনে করা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা হয়, তাঁকে স্নান করানো হয়, নতুন পোশাক পরানো হয় এবং ধৈর্যশীল আলোচনার মাধ্যমে তাঁর পরিচয় পুনরুদ্ধার করা হয়। পুলিশের এই চেষ্টার ফলে বহুদিন ধরে নিখোঁজ থাকা এক ব্যক্তি তাঁর পরিবারের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হতে পেরেছেন। এই ঘটনাটি পুলিশের মানবিক ও সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরে। এই মুহূর্তটি হানসা সিংয়ের বৃদ্ধা মা জত্তো কৌরের জন্য ছিল সবচেয়ে আবেগঘন। ফোনে ছেলের কণ্ঠস্বর শুনে তাঁর চোখে জল এসে গিয়েছিল। তিনি বলেন যে, কেবল ছেলেকে দেখতে পেলেই তিনি শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারবেন।

পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হওয়া হানসা সিং এখন তাঁর পরিবারের সঙ্গে পাঞ্জাবে ফিরে গেছেন। তবে, তাঁর ফিরে আসার ফলে সৃষ্ট সামাজিক ও আইনি প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, বরং সমাজে সম্পর্কের জটিলতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষের টিকে থাকার ক্ষমতার এক জীবন্ত উদাহরণ। এটি দেখায় কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায় এবং একটিমাত্র সিদ্ধান্তের প্রভাব বছরের পর বছর ধরে স্থায়ী হতে পারে।