আইআইটি বম্বের ছাত্র সাহিল ওয়াকোড়ের আত্মহত্যার তদন্ত করছে মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চ। পরীক্ষার হল ও ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজই এখন মূল ভরসা। এদিকে ক্যাম্পাসে পড়ুয়াদের বিক্ষোভের জেরে এক অধ্যাপককে ডিন পদ থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
তদন্তে তুরুপের তাস সিসিটিভি ফুটেজ
আইআইটি বম্বের ছাত্র সাহিল রবীন্দ্র ওয়াকোড়ের আত্মহত্যার তদন্তে নেমেছে মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। মঙ্গলবার ক্রাইম ব্রাঞ্চের এক আধিকারিক জানান, পরীক্ষার হল, ক্যাম্পাস এবং হস্টেলের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
ওই আধিকারিক আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সিসিটিভি ফুটেজ এখনও কাউকে দেখানো হয়নি বা প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তকারী দল আপাতত সেটি খতিয়ে দেখছে।
ছাত্রের শেষ মুহূর্তের টাইমলাইন
ক্রাইম ব্রাঞ্চ জানিয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ৩০ থেকে ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত পরীক্ষার হলের ভিতরের সিসিটিভি ক্যামেরায় সাহিলের গতিবিধি ধরা পড়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার তখন আর মাত্র ১৫ মিনিট বাকি। সেই সময় সাহিলকে পকেট থেকে কিছু একটা বের করে নিচু হয়ে দেখতে দেখা যায়। পুলিশের দাবি, এরপরই এক অধ্যাপক তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং অন্য ছাত্রদের থেকে আলাদা করে সরিয়ে নিয়ে যান।
ক্রাইম ব্রাঞ্চের ওই আধিকারিক বলেন, "পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে সাহিল ক্যাম্পাসের দিকে যায়। দুপুর ১টা ২৫ মিনিট নাগাদ সে নিজের হস্টেলের ঘরে পৌঁছায়। এরপর আর সে ঘর থেকে বেরোয়নি।" সাহিল এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের বিটেক ছাত্র ছিল। ওই দিনই পরে হস্টেলের ঘর থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়।
পরীক্ষার হল থেকে হস্টেল পর্যন্ত সাহিল ঠিক কোথায় কোথায় গিয়েছিল, তা মেলাতে এখন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গার ফুটেজ জোড়া লাগাচ্ছে ক্রাইম ব্রাঞ্চ। মৃত্যুর আগে ঠিক কী কী ঘটেছিল, তা জানতেই এই পদক্ষেপ।
ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও পড়ুয়াদের বিক্ষোভ
সাহিলের মৃত্যুর পর আইআইটি বম্বেতে বিক্ষোভ ও পাল্টা বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। উত্তেজনার আবহে মঙ্গলবার ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়।
সোমবার আইআইটি বম্বের ছাত্র প্রতিনিধিরা জানান, তাঁদের এই বিক্ষোভ কোনওভাবেই পরীক্ষায় নকল করা বা নিয়ম ভাঙাকে সমর্থন করার জন্য নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের ভিতরের কাঠামোগত সমস্যাগুলো তুলে ধরা এবং সংস্কারের দাবিতেই এই আন্দোলন। প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তাঁরা বেশ কিছু দাবিদাওয়া ডিরেক্টরের কাছে জমা দিয়েছেন। ডিরেক্টর তাতে সই করেছেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।
অধ্যাপকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার বিষয়ে পড়ুয়ারা জানান, তাঁরা তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করছেন না। তাঁদের দাবি ছিল, তদন্ত চলাকালীন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দুল্লাকে 'ডিন অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাফেয়ার্স'-এর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক। আইআইটি বম্বের জনসংযোগ আধিকারিক স্পষ্ট করেছেন যে, দুল্লাকে শুধুমাত্র ডিন পদ থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
এর আগে সোমবার, দুল্লার সমর্থনে ক্যাম্পাসে মিছিল করে আইআইটি বম্বে ফ্যাকাল্টি ফোরাম। ফোরামের দাবি, সেনেট-অনুমোদিত নিয়ম মেনেই তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফ্যাকাল্টি ফোরাম জানিয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মিড-সেমিস্টার পরীক্ষায় নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন কোর্স ইনস্ট্রাক্টর দুল্লা। তখনই তিনি এক ছাত্রকে লুকিয়ে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে দেখেন। ফোরাম এই ঘটনাকে “অ্যাকাডেমিক ম্যালপ্র্যাকটিস” বা নিয়মভঙ্গ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে, নিয়ম মেনেই দুল্লা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
পরিবারের তরফে জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ
সাহিলের পরিবারের অভিযোগ, জাতিগত বৈষম্যের শিকার হয়েছিল সে। এই ঘটনার সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। বৈষম্যের অভিযোগ তুলে সাহিলের বাবা-মা এসসি/এসটি (SC/ST) আইনে মামলাও দায়ের করেছেন। পরিবারের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ তাঁদের দেখাতে হবে। সাহিলের মৃত্যুর পিছনে একাধিক ব্যক্তির হাত থাকতে পারে বলেও তাঁদের সন্দেহ।
বিবৃতি প্রত্যাহার কর্তৃপক্ষের, মামলা গেল ক্রাইম ব্রাঞ্চে
গত ১৯ সেপ্টেম্বর একটি বিবৃতিতে আইআইটি বম্বে জানিয়েছিল, ওই ছাত্র পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। সে নাকি ফোনে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)-র সাহায্যে উত্তর খুঁজছিল। তবে পরে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়ে নেয় এবং আগের বিবৃতি প্রত্যাহার করে। মুম্বই পুলিশ ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই মামলার তদন্তভার ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে তুলে দিয়েছে।


