লাদাখের দুর্গম পাহাড়ে যুদ্ধের জন্য তৈরি ভারতের জোরাওয়ার লাইট ট্যাঙ্ক এবার প্রোডাকশনের পথে। ২৫ টন ওজনের এই ট্যাঙ্ক অনায়াসেই পাহাড়ি রাস্তায় চলতে পারে। আর বায়ুসেনার সি-১৭ বিমানে একসঙ্গে দুটো ট্যাঙ্ক খুব সহজেই উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,২০০ মিটারেরও বেশি উঁচুতে লাদাখের ন্যোমা। এখানকার বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ এতটাই কম যে, মানুষ তো বটেই, যন্ত্রেরও হাঁসফাঁস অবস্থা হয়। মানুষের ফুসফুসের মতোই ইঞ্জিনেরও কাজ করার জন্য অক্সিজেন লাগে। আর এত উঁচুতে সেনার শক্তিশালী টি-৭২ (T-72) এবং টি-৯০ (T-90) ট্যাঙ্কও কিছুটা শক্তি হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (LAC) ওপারে চিন ইতিমধ্যেই তাদের টাইপ-১৫ (Type-15) লাইট ট্যাঙ্ক নামিয়ে দিয়েছে। ঠিক এই ধরনের পাহাড়ি এলাকার জন্যই ওই ট্যাঙ্কগুলো তৈরি। এর জবাবেই ভারত নিয়ে এসেছে 'জোরাওয়ার'। বরফে ঢাকা ওই দুর্গম উচ্চতায় পাহারারত জওয়ানদের কাছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই ট্যাঙ্ক কীভাবে পৌঁছবে, তা এবার চূড়ান্ত করে ফেলেছে দেশ।
জোরাওয়ারের ওজন প্রায় ২৫ টন। টি-৭২ বা টি-৯০ ট্যাঙ্কের ওজনের প্রায় অর্ধেক। এই হালকা হওয়াই এর সবচেয়ে বড় শক্তি। ভারী ট্যাঙ্ক যেখানে হাঁপিয়ে ওঠে, সেখানে জোরাওয়ার অনায়াসেই পাহাড়ে চড়তে পারে। আর এর ফলে ভারতীয় বায়ুসেনার একটি সি-১৭ (C-17) ভারী পরিবহণ বিমানে একসঙ্গে দুটো জোরাওয়ার ট্যাঙ্ক সহজেই বহন করা যায়।
এই ট্যাঙ্ক তৈরির নেপথ্যে রয়েছে এক নীরব অধ্যবসায়ের গল্প। ২০২২ সালের মার্চ মাসে এই প্রজেক্টের অনুমোদন মেলে। ডিআরডিও-র (DRDO) ল্যাবরেটরি কমব্যাট ভেহিকেলস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিশমেন্ট (CVRDE) এর নকশা তৈরি করে। সিস্টেম ইন্টিগ্রেটর হিসেবে কাজ করেছে লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T)। বিভিন্ন কারখানা থেকে ইঞ্জিন, বন্দুক, আর্মার প্লেট এবং ইলেকট্রনিক্স জোগাড় করে সেগুলোকে একটা আস্ত ট্যাঙ্কের রূপ দেওয়াই ছিল তাদের কাজ। বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প সংস্থাও (MSME) এর গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে। অনুমোদনের ঠিক দু'বছরের মাথায়, ২০২৪ সালের ৬ জুলাই গুজরাটের হাজিরায় এলঅ্যান্ডটি-র প্ল্যান্টে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ট্যাঙ্ক প্রকাশ্যে আনা হয়। ভারতের মতো দেশে নতুন সাঁজোয়া গাড়ির ক্ষেত্রে এই গতি সত্যিই প্রশংসনীয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে লোকসভায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর নকশা, উন্নয়ন এবং একটি প্রোটোটাইপ তৈরির অনুমোদিত খরচ ২৩৪.৫ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মরুভূমির পরিবেশে ফায়ারিং ট্রায়ালের প্রথম ধাপ শেষ করে ডিআরডিও। এরপর ন্যোমাতেও এর ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। হাজিরায় যে ট্যাঙ্কটি দেখানো হয়েছে এবং মরুভূমি ও পাহাড়ে যার পরীক্ষা হয়েছে, সেটি আসলে একটি প্রোটোটাইপ বা নমুনা। নকশাটি যে ঠিকঠাক কাজ করছে, তা প্রমাণ করার জন্যই এটি তৈরি। সেনাবাহিনী আসলে যে ট্যাঙ্কগুলো কিনবে, সেগুলো হলো প্রোডাকশন ট্যাঙ্ক। সেনার অনুমোদিত মান অনুযায়ী এগুলো বেশি সংখ্যায় তৈরি করা হবে। আর এই মান নিয়েই একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
রবিবার নয়াদিল্লিতে এক প্রতিরক্ষা সম্মেলনে প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিং বিষয়টি খোলসা করেন। তিনি জানান, একটা প্রজেক্ট যখন শুরু হয়, তখন কিছু নির্দিষ্ট চাহিদা থাকে। কিন্তু কাজ এগোতে থাকলে আরও নতুন নতুন ফিচার ও ক্ষমতার দাবি উঠতে থাকে। এর ফলে ট্যাঙ্কটি সেনার হাতে আসতে দেরি হতে পারে।
এই সমস্যা মেটাতে তিনি দুটি ধাপের কথা ঘোষণা করেন। ৫৯টি ট্যাঙ্কের প্রাথমিক অর্ডারের মধ্যে প্রথম ব্যাচে প্রায় ১৮টি ট্যাঙ্ক তৈরি হবে, যার নাম জোরাওয়ার মার্ক ১ (Zorawar Mk1)। এতে সুরক্ষার স্তর কিছুটা কম থাকবে। ওই অর্ডারের বাকি ট্যাঙ্কগুলো আরও উন্নত মানের তৈরি করা হবে। তিনি বলেন, "আমরা প্রথমে জোরাওয়ার মার্ক ১ তৈরির পরিকল্পনা করেছি, যার একটা নির্দিষ্ট স্তরের ক্ষমতা থাকবে।"
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে একটা মাঝামাঝি রাস্তা হিসেবেই এই ব্যবস্থাকে দেখছেন তিনি। তিনি বলেন, "আমরা এমন একটা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছি যা দু'পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়।" তিনি আরও জানান, তাঁর বর্তমান পদের কারণেই এই ধরনের মতপার্থক্য মেটানোর সুযোগ তিনি পেয়েছেন। তাঁর কথায়, সেনাবাহিনী বেশিরভাগ বিষয়েই রাজি হয়েছে এবং মন্ত্রক এই পথেই এগোতে চাইছে।
এই প্রথম ব্যাচটি আগে তৈরির পেছনে একটা মানবিক কারণও রয়েছে। যে দলগুলো বছরের পর বছর ধরে একটা যন্ত্রের পেছনে সময় দিয়েছে, তাদেরও তো সেটা তৈরি হতে দেখা দরকার। প্রতিরক্ষা সচিব জানান, এলঅ্যান্ডটি-র উৎসাহ ধরে রাখতেই মার্ক ১-এর অর্ডার দেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই কোম্পানিটি প্রায় ১৮টি ট্যাঙ্কের অর্ডার পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত দাবিগুলো মেটানো হবে আরও সুরক্ষিত ভার্সন জোরাওয়ার মার্ক ২-তে (Zorawar Mk2)। রিপোর্ট অনুযায়ী, এর সামনের দিকে স্ট্যানাগ লেভেল ৬ (STANAG Level 6) আর্মার এবং পাশে লেভেল ৫বি (Level 5B) আর্মার থাকার কথা। স্ট্যানাগ হলো এমন একটা স্কেল যা দিয়ে মাপা হয় একটা আর্মার কতটা আঘাত সহ্য করতে পারে। লেভেল যত বেশি, বর্ম তত শক্ত। অর্থাৎ, সামনের দিকটা খুব শক্তভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং পাশের দিকটা সামান্য কম। সহজ কথায়, এই আর্মার প্রায় ৫০০ মিটার দূর থেকে ছোড়া ২৫ মিমি এবং ৩০ মিমি এপিএফএসডিএস (APFSDS) গোলা আটকাতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এপিএফএসডিএস হলো এমন এক শক্তিশালী গোলা যা ট্যাঙ্কের বর্ম ভেদ করার জন্যই তৈরি।
ট্যাঙ্কের সুরক্ষায় আরও দুটি ব্যবস্থা থাকার কথা। অ্যাক্টিভ প্রোটেকশন সিস্টেম (APS) অনেকটা সতর্ক গোলকিপারের মতো কাজ করে। এটি ধেয়ে আসা বিপদ আগে থেকেই টের পেয়ে যায় এবং আঘাত হানার আগেই তা আটকে দেয়। এছাড়া, ইন-বিল্ট সি-ইউএএস (C-UAS) জ্যামার শত্রুপক্ষের ড্রোনকে বিকল করে দিতে পারে।
তবে সুরক্ষার জন্য ওজনের দিক থেকে কিছুটা দাম চোকাতেই হয়। রিপোর্ট বলছে, এই নতুন সংযোজনগুলোর ফলে ট্যাঙ্কের ওজন প্রায় ৫ থেকে ৭ টন বেড়ে যেতে পারে। ফলে জোরাওয়ারের ওজন দাঁড়াবে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ টন। ডিআরডিও অবশ্য আগে থেকেই এটা আঁচ করেছিল। আগের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভবিষ্যতের আপগ্রেডের কথা মাথায় রেখে ট্যাঙ্কটিকে এমনভাবেই ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে এটি ৩৫ টন পর্যন্ত ওজন সামলাতে পারে। মূল ভাবনার মধ্যেই অতিরিক্ত আর্মারের জন্য জায়গা রাখা হয়েছিল।
শরীর ভারী হলে তার জন্য শক্তিশালী ইঞ্জিনও দরকার। বর্তমান প্রোটোটাইপগুলো কামিন্স ভিটিএ৯০৩ই-টি৭৬০ (Cummins VTA903E-T760) ডিজেল ইঞ্জিনে চলছে, যা ৭৬০ হর্সপাওয়ার শক্তি তৈরি করে। মার্ক ১ ট্যাঙ্কগুলোতেও একই ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভারী ভার্সনটির জন্য রিপোর্ট বলছে, কামিন্স তাদের ১,০০০ হর্সপাওয়ারের অ্যাডভান্সড কমব্যাট ইঞ্জিন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের কথাও বলা হয়েছে, যাতে এটি ভারতেই তৈরি করা যায়। ডিআরডিও ইতিমধ্যেই এই প্রজেক্টের জন্য একটি ৮০০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন তৈরি করেছে। শোনা যাচ্ছে, তারা নিজেদের একটি ১,০০০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন নিয়েও কাজ করছে, যা সম্ভবত ৮০০ এইচপি ডিজাইনেরই আরও শক্তিশালী রূপ। নতুন ইঞ্জিনের জন্য ভারতীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও আলোচনা চলছে। তবে মার্ক ২-এর জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
ভারতীয় শিল্প সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই অন্যভাবে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানগুলোকে শক্তি জোগাচ্ছে। চলতি মাসেই টি-৭২ এবং টি-৯০ ট্যাঙ্কের অক্সিলিয়ারি পাওয়ার ইউনিটের (APU) জন্য অ্যাকুরেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল কন্ট্রোলস-এর সঙ্গে ৫৮৬ কোটি টাকার চুক্তি সই করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। এপিইউ হলো একটা ছোট অতিরিক্ত ইঞ্জিন। মূল ইঞ্জিন বন্ধ থাকলেও এটি ট্যাঙ্কের যন্ত্রপাতিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এর ফলে জ্বালানি বাঁচে এবং মূল ইঞ্জিনের ওপর চাপও কমে।
ডিআরডিও এবং এলঅ্যান্ডটি-কে দেওয়া ৫৯টি ট্যাঙ্কের অর্ডারটিকে আসলে একটা শুরুর ধাপ হিসেবেই দেখা ভালো। সেনাবাহিনীর মোট প্রায় ৩৫৪টি লাইট ট্যাঙ্ক দরকার। তাই এই প্রথম লটটি মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশেরও কম। বাকি বড় বহরটি তৈরির লড়াই এখনও চলছে। প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকার ওই প্রজেক্টে টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস (Tata Advanced Systems) সবচেয়ে কম দর হাঁকিয়েছে বলে খবর। তাদের ১৩০ সপ্তাহের মধ্যে দুটি প্রোটোটাইপ ট্যাঙ্ক তৈরি করে দিতে হবে। এই বাছাই পর্বে তিন বছর সময় লেগেছে। অন্য এক দরদাতার আপত্তির কারণে আরও দেরি হয়, যদিও পরে সেই আপত্তি বাতিল হয়ে যায়। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে মাহিন্দ্রা ডিফেন্সও (Mahindra Defence) একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করবে।
লাদাখের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় পাহারারত জওয়ানদের কাছে এই সংখ্যাগুলোর একটাই অর্থ: নিজের দেশে তৈরি, নিজের দেশের পাহাড়ের জন্য মানানসই একটা ট্যাঙ্ক অবশেষে তাদের কাছে পৌঁছতে চলেছে।
(গিরীশ লিঙ্গান্না একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞান সঞ্চালক এবং প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি জার্মানির এডিডি ইঞ্জিনিয়ারিং জিএমবিএইচ-এর সহযোগী সংস্থা এডিডি ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পোনেন্টস ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর।)


