রবিবার 'মন কি বাত' অনুষ্ঠানে দেশজুড়ে চলা পুষ্টি মাসের উদ্যোগের প্রশংসা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছত্তিশগড় থেকে মিজোরাম— অপুষ্টি দূর করতে সাধারণ মানুষের নানা প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন তিনি।

রবিবার 'মন কি বাত' অনুষ্ঠানে দেশজুড়ে চলা পুষ্টি মাসের উদ্যোগের প্রশংসা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছত্তিশগড় থেকে মিজোরাম— অপুষ্টি দূর করতে সাধারণ মানুষের নানা প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি থাইল্যান্ডে গণেশ পুজো এবং গুজরাটের মোধেরা সূর্য মন্দিরের ইতিহাস নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

অপুষ্টি দূর করতে আহ্বান প্রধানমন্ত্রী মোদীর

রবিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অপুষ্টি দূর করার লড়াইয়ে দেশের নানা প্রান্তের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তিনি জানান, সেপ্টেম্বর মাসটি এই সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। নিজের 'মন কি বাত' অনুষ্ঠানে মোদী বলেন, পুষ্টি মাস চলাকালীন বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ এবং সংগঠন এই মহৎ কাজে এগিয়ে আসছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, "অপুষ্টি দূর করতে এই বছর বেশ কিছু দারুণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন, ছত্তিশগড়ে শুরু হয়েছে 'হর ঘর মুঙ্গা - ঘর ঘর মুঙ্গা' প্রচার। এর মাধ্যমে মানুষকে নিজেদের রোজকার খাবারে পুষ্টিকর মুঙ্গা অর্থাৎ সজনে ডাঁটা বা পাতা রাখতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। গুজরাটেও 'ভাঙ্গি স্পর্ধা' নামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বাজরা দিয়ে তৈরি নানা পদের এই প্রতিযোগিতায় এখনও পর্যন্ত ২ লাখেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। এর ফলে সস্তা ও পুষ্টিকর স্থানীয় খাবার জনপ্রিয় হচ্ছে।"

তিনি আরও বলেন, "মহারাষ্ট্রও এই দিকে দারুণ কাজ করছে। সেখানে শিক্ষক, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং অভিভাবকরা সচেতনতা প্রচারে যোগ দিচ্ছেন। মিজোরামেও মানুষ এই বছর 'পোষণ বাটিকা' বা পুষ্টি বাগান তৈরির জন্য একজোট হয়েছেন। এটি মিজোদের 'তালো-মাদ-ইয়ানা' ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলে যায়, যার অর্থ নিঃস্বার্থ সেবা এবং অন্যকে সাহায্য করতে সবসময় এগিয়ে থাকা। এই ধরনের প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।"

অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের প্রশংসা মোদীর

অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলির সঙ্গে যুক্ত মানুষদেরও প্রশংসা করেন মোদী। তিনি বলেন, "এই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি এখন 'পোষণ ট্র্যাকার'-এর মাধ্যমে ডিজিটালি যুক্ত। প্রায় ৯ কোটি সুবিধাভোগী এই প্ল্যাটফর্মে নাম লিখিয়েছেন। এর ফলে শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং স্তন্যদাত্রী মায়েদের আরও ভালো যত্ন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আমাদের একই মানসিকতা নিয়ে অপুষ্টির বিরুদ্ধে এই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সমাজকে পুরোপুরি অপুষ্টিমুক্ত করতে হবে।"

প্রসঙ্গ গণেশ উৎসব

সম্প্রতি শেষ হওয়া গণেশোৎসবের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, থাইল্যান্ডে ভগবান শ্রী গণেশকে 'ফ্রা ফিকানেট' হিসেবে পুজো করা হয়। থাইল্যান্ডের বাসিন্দা পান্থৌন থিরখাননের ভক্তির কথা স্মরণ করে মোদী বলেন, তিনি উত্তর থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই শহরে 'গণেশ হিমাল মিউজিয়াম' তৈরি করেছেন। ভারতের বিশ্বাস, শিল্প এবং সংস্কৃতির ঐতিহ্য যে অন্য দেশেও জনপ্রিয় হচ্ছে, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।

মোদী বলেন, "এই মাসে আমরা সবাই দারুণ ভক্তি ও উৎসাহের সঙ্গে গণেশ উৎসব পালন করেছি। গোটা দেশে গণপতি বাপ্পাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বাগত জানানো হয়েছে। এই পবিত্র উৎসব চারপাশের পরিবেশকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। বিঘ্নহর্তা ভগবান শ্রী গণেশ হলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং যে কোনও কাজের শুভ সূচনার প্রতীক। শুধু ভারতেই নয়, তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অন্য দেশেও রয়েছে। থাইল্যান্ডের শ্রীমান পান্থৌন থিরখাননজির কথাই ধরুন।"

"সেখানে ভগবান শ্রী গণেশকে 'ফ্রা ফিকানেট' হিসেবে পুজো করা হয়। পান্থৌনজির বয়স যখন ১৯ বছর, তখন তাঁর বাবা তাঁকে ভগবান শ্রী গণেশের একটি ছবি উপহার দিয়েছিলেন। তখন থেকেই তাঁর মনে গভীর ভক্তি জেগে ওঠে। ভগবান শ্রী গণেশের সঙ্গে যুক্ত নানা ঐতিহ্য নিয়ে তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পড়াশোনা করেছেন। ভারত ও নেপাল-সহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে তিনি ঘুরেছেন। মহারাষ্ট্রের প্রতি তাঁর বিশেষ টান রয়েছে," জানান প্রধানমন্ত্রী।

সোমনাথ ও সূর্য মন্দির প্রসঙ্গ

মোদী জানান, অষ্টবিনায়ক ঐতিহ্যের কথা জানার পর পান্থৌন থিরখানন ওই অঞ্চলে বহুবার এসেছেন। "তাঁর প্রচেষ্টায় থাইল্যান্ডের ভক্তদের মধ্যেও অষ্টবিনায়ক যাত্রা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০০২ সালে তিনি উত্তর থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ে গণেশ হিমাল মিউজিয়াম তৈরি করেন। আজ সেখানে গণেশের ১০ হাজারেরও বেশি মূর্তি রয়েছে। যে ভক্তরা ভারতে আসতে পারেন না, তাঁদের জন্য মিউজিয়ামে অষ্টবিনায়ক মূর্তিও রাখা আছে। এখানে প্রতি রবিবার সকাল ১০টা নাগাদ গণেশজির পুজোপাঠ হয়। এছাড়া গণেশের সঙ্গে যুক্ত বিশেষ দিনগুলিতে উৎসবও পালন করা হয়। আমি চাই গণপতি বাপ্পার আশীর্বাদ সবসময় সবার ওপর থাকুক।"

এরপর গুজরাটের মোধেরা প্রসঙ্গ টানেন মোদী। অতীতে এই সূর্য মন্দিরে বহুবার হামলা হয়েছিল। তবে আজ এই গ্রামটি শুধু বিখ্যাত মন্দিরের জন্যই নয়, দেশের প্রথম 'সূর্য গ্রাম' বা 'সোলার ভিলেজ' হিসেবেও পরিচিত।

মোদী বলেন, "এই বছরটা আমরা জাতীয় গর্বের এক বিশাল উদযাপনের মাধ্যমে শুরু করেছিলাম। সেটা ছিল 'সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব'। হাজার বছর আগে, ১০২৬ সালে মামুদ গজনভি প্রথমবার সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। কিন্তু যারা সোমনাথকে ধ্বংস করতে এবং ভারতের পরিচয় মুছে ফেলতে এসেছিল, আজ তাদের কোনও অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে সোমনাথ মন্দির বিশাল সমুদ্রের ধারে নিজের সমস্ত গরিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা ভারতকে অমরত্বের আশীর্বাদ দিচ্ছে। সেই কারণেই আমরা এই বছর দারুণ গর্বের সঙ্গে 'সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব' পালন করেছি।"

"আজ 'মন কি বাত'-এ কেন আমি আবার এই কথা তুলছি, তার একটা বিশেষ কারণ আছে। ১০২৬ খ্রিস্টাব্দে গজনভি যখন সোমনাথ ধ্বংস করেন, সেই একই বছর গুজরাটের মোধেরার বিখ্যাত সূর্য মন্দিরেও হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করা হয়েছিল। তার মানে মোধেরা মন্দির ধ্বংসেরও হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। অথচ সেই মন্দিরটি তার ঠিক এক বছর আগেই তৈরি হয়েছিল। রাজা ভীমদেব ১০২৫ সালে এটি তৈরি করিয়েছিলেন।"

মোদী জানান, রাজা ভীমদেব শুধু গজনভির বাহিনীর মোকাবিলাই করেননি, অল্প সময়ের মধ্যে মোধেরা সূর্য মন্দিরটি নতুন করে তৈরিও করিয়েছিলেন। "সেই যুগের কথা একবার ভাবুন। একটা বিশাল আক্রমণ হয়েছিল, সোমনাথ মন্দিরের মতো একটা বড় আস্থার জায়গা ভাঙচুর করা হয়েছিল, আর নানা জায়গায় হামলা চলছিল। যে কোনও সমাজ বা প্রশাসনের মনোবল ভেঙে যেতে পারত। তবুও প্রথম রাজা ভীমদেব শুধু গজনভির বাহিনীর মোকাবিলাই করেননি, অল্প সময়ের মধ্যে মোধেরা সূর্য মন্দিরটি নতুন করে তৈরিও করিয়েছিলেন। এই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতার জন্যই বারবার ধ্বংস হওয়ার পরও সোমনাথ মন্দির প্রতিবার নতুন করে তৈরি হয়েছে।"

মোদী আরও বলেন, "পরবর্তীকালেও মোধেরা সূর্য মন্দিরের ওপর হামলা থামেনি। আলাউদ্দিন খিলজি পরে এই মন্দির, এই অসাধারণ স্থাপত্যের নিদর্শনটি আবার ধ্বংস করেন। তবে বন্ধুরা, আমরা ভারতবাসীরা শুধু স্থাপত্য আর মন্দিরের মাধ্যমেই সূর্যের পুজো করি না। আমাদের কাছে সূর্য পুজো মানে আলো, শক্তি, বিজ্ঞান এবং এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণাও। সেই কারণেই মোধেরা আজ শুধু তার সূর্য মন্দিরের জন্যই পরিচিত নয়, গুজরাটের এই গ্রামটি দেশের প্রথম 'সূর্য গ্রাম' বা 'সোলার ভিলেজ' হয়ে উঠেছে।"

প্রধানমন্ত্রী জানান, মোধেরা এখন পুরোপুরি সৌরশক্তিতে চলে, যা গোটা দেশের কাছে একটা দারুণ উদাহরণ। "পর্যটকদের জন্য মোধেরায় বেশ কিছু আকর্ষণীয় জিনিস ও সুযোগ-সুবিধাও চালু করা হয়েছে। মকর সংক্রান্তির পর জানুয়ারিতে সেখানে মোধেরা ডান্স ফেস্টিভ্যাল হয়, যেখানে ভারতের সাংস্কৃতিক ও শাস্ত্রীয় নাচের দারুণ সব অনুষ্ঠান থাকে। আমি আপনাদের সবাইকে অন্তত একবার মোধেরায় গিয়ে ভারতের এই গৌরবময় ঐতিহ্য দেখার অনুরোধ করব।"

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের সঙ্গে যুক্ত থাকলে ঐতিহ্যকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। "অতীতের সঙ্গে আমাদের যোগসূত্র আজও খুব জীবন্ত। যারা এই সম্পর্ককে আরও গভীর করছেন, তাঁদের নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে এটা সম্ভব হচ্ছে। তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লির মানাপ্পারাইয়ে এই ধরনেরই একটি অভিনব উদ্যোগ চলছে। একটি কলেজের তামিল স্টাডিজ বিভাগের সঙ্গে যুক্ত এ. সেলভারাজুজি এই কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একটি লেকচার চলাকালীন তিনি এক ছাত্রের কাছ থেকে কিছু প্রাচীন ভাস্কর্যের কথা জানতে পারেন।"

মোদী বলেন, "এই বিষয়ে আলোচনার পর তিনি সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেখানে গিয়ে তিনি নানা জায়গায় বেশ কিছু ভাস্কর্য এবং প্রাচীন মন্দির খুঁজে পান। অতীতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এটা একটা দারুণ উপায়। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। দেশের অন্যান্য প্রান্তেও এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে... এগুলো আমাদের ইতিহাসকে আরও কাছ থেকে দেখার ও বোঝার সুযোগ করে দেয়।"