ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করে একটি প্রবন্ধ লিখলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, দেশের ঐক্য ও প্রগতির জন্য শ্যামাপ্রসাদের জীবন উৎসর্গীকৃত ছিল এবং তাঁর দেখানো পথেই 'বিকশিত ভারত'-এর লক্ষ্যে এগোচ্ছে দেশ।
সোমবার ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি শ্যামাপ্রসাদকে একজন রাষ্ট্রনির্মাতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যাঁর জীবন ভারতের একতা, অখণ্ডতা এবং প্রগতির জন্য উৎসর্গীকৃত ছিল। 'ভারতের একতা ও প্রগতির জন্য উৎসর্গীকৃত এক জীবন'—এই শিরোনামের প্রবন্ধে প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, শিক্ষা, শিল্প, মানবসেবা এবং জাতীয় সংহতিতে শ্যামাপ্রসাদের অবদান আজকের 'বিকশিত ভারত' গড়ার যাত্রায় দেশকে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী ডঃ মুখোপাধ্যায় জীবনকে 'সাহস এবং মাতৃভূমির প্রতি অটল নিষ্ঠার' এক উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি শ্যামাপ্রসাদকে একজন বিরল নেতা বলে উল্লেখ করেন, যাঁর মধ্যে পাণ্ডিত্য, জনসেবা এবং দৃঢ় নৈতিক মূল্যবোধের মেলবন্ধন ছিল।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা মোদীর
মোদী লিখেছেন, "আজ, ৬ই জুলাই, জাতীয়তাবাদ এবং নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শে বিশ্বাসী লক্ষ লক্ষ দেশবাসীর জন্য একটি অত্যন্ত বিশেষ দিন। আজ আমরা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করছি। তাঁর জীবন সাহস এবং মাতৃভূমির প্রতি অটল নিষ্ঠার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিত্ব ছিল পাণ্ডিত্য, জনসেবা এবং উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধের এক অসাধারণ মিশ্রণ। আধুনিক ভারতে খুব কম নেতাই একসঙ্গে এতগুলো গুণের অধিকারী ছিলেন।"
প্রধানমন্ত্রী আরও লিখেছেন, এক ধনী পরিবারে জন্ম নিয়েও ডঃ মুখোপাধ্যায় ত্যাগের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক বিপর্যয়, যেমন অল্পবয়সী সন্তানের মৃত্যু এবং পরে স্ত্রীর মৃত্যু, তাঁকে জনসেবার পথ থেকে সরাতে পারেনি। বরং এই ব্যক্তিগত ক্ষতিগুলো জাতীয় সেবায় তাঁর জীবন উৎসর্গ করার সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করেছিল।
মোদী এরপর দেশভাগের সময় ভারতের ঐক্য রক্ষায় এবং জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে তাঁর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শ্যামাপ্রসাদের এই আত্মত্যাগই পরে ৩৭০ এবং ৩৫(এ) ধারা বাতিলের মাধ্যমে স্বীকৃতি পেয়েছে।
তিনি লিখেছেন, "ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতের একতা ও অখণ্ডতা রক্ষা করা। দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কয়েক বছর পর, একই লক্ষ্যে তিনি জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতেও লড়াই করেছিলেন। জেল বা গৃহবন্দিত্বও তাঁকে তাঁর পথ থেকে সরাতে পারেনি। বন্দিদশায় যখন তাঁর মৃত্যু হয়, তখন তিনি সেই অগণিত মানুষ থেকে অনেক দূরে ছিলেন, যাঁদের জন্য তিনি সারাজীবন লড়াই করেছেন। ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ রাজনীতিকে ছাপিয়ে গিয়ে দেশের স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ডঃ মুখোপাধ্যায়ের আত্মত্যাগ তেমনই একটি উদাহরণ।"
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাক্ষেত্রেও ডঃ মুখোপাধ্যায়ের অবদানের কথা তুলে ধরেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে তাঁর কার্যকাল এবং উচ্চশিক্ষাকে আধুনিক করার প্রচেষ্টার কথা স্মরণ করেন তিনি।
ডঃ মুখার্জীকে উদ্ধৃত করে মোদী লিখেছেন, "শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু কেরানি বা স্বল্প বেতনের কর্মচারী তৈরির কারখানা হিসেবে দেখাটা ভুল। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের নেতৃত্বের ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। পৌরসভা, প্রাদেশিক এবং কেন্দ্রীয় আইনসভার মতো আমাদের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদের বৃহত্তর দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অর্থ, বাণিজ্য এবং শিল্পের মতো ক্ষেত্রেও তাদের প্রতিভা প্রদর্শনে সক্ষম হতে হবে।"
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন ভারতের শিল্প বিকাশেও ডঃ মুখোপাধ্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন এবং সিন্দ্রি ফার্টিলাইজার প্ল্যান্টের মতো প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপনের কৃতিত্ব তিনি শ্যামাপ্রসাদকে দেন। একই সঙ্গে তাঁত, কুটির শিল্প এবং কারিগরদেরও তিনি সমর্থন জুগিয়েছিলেন।
তাঁর সরকারের অধীনে সিন্দ্রি ফার্টিলাইজার প্ল্যান্টের পুনরুজ্জীবনের কথা স্মরণ করে মোদী লিখেছেন, "আত্মনির্ভর ভারতের সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে ডঃ মুখার্জী যে সিন্দ্রি প্ল্যান্ট প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা সেটিকে চরমভাবে উপেক্ষা করেছিল। আমি আনন্দিত যে আমাদের সরকার এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার সৌভাগ্য পেয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকাটা আমার জনজীবনের অন্যতম বিশেষ এবং অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।"
প্রধানমন্ত্রী ডঃ মুখোপাধ্যায়কে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক দৃঢ় বিশ্বাসী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশ গড়ার স্বার্থে ডঃ মুখার্জী জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেও, যখন তিনি মনে করেছিলেন যে জাতীয় স্বার্থে অন্য পথ নেওয়া প্রয়োজন, তখন তিনি পদত্যাগ করেন।
মোদী প্রথম সাংবিধানিক সংশোধনীতে ডঃ মুখোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কথাও উল্লেখ করেন এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পরে জরুরি অবস্থা জারি এবং ৪২তম সাংবিধানিক সংশোধনী পাসের জন্য সমালোচনা করেন।
১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪২ সালের মেদিনীপুর ঘূর্ণিঝড়ের পর ত্রাণকার্যে ডঃ মুখোপাধ্যায়ের মানবিক ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর জনজীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সহানুভূতি।
প্রবন্ধটি শেষ হয়েছে তরুণদের প্রতি ডঃ মুখোপাধ্যায়ের একটি বার্তা দিয়ে: "তোমরা যা কিছুই করো না কেন, তা সম্পূর্ণ নিষ্ঠা এবং সততার সঙ্গে করো। কোনও কাজ অসমাপ্ত রেখো না। যতক্ষণ না তুমি তোমার সেরাটা দিয়েছ, ততক্ষণ নিজেকে সন্তুষ্ট মনে কোরো না।"
তরুণদের ডঃ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে মোদী বলেন, 'একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী এবং সংবেদনশীল ভারত' গড়াই হবে তাঁর প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা। 'বিকশিত ভারত'-এর লক্ষ্যের দিকে কাজ করার কথাও বলেন তিনি।
মোদী লিখেছেন, "আজ আমাদের দেশ উন্নত ভারতের লক্ষ্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। তাঁর কল্পনার ভারতকে গড়ে তোলার জন্য প্রতিদিন চেষ্টা করাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের সত্যিকারের শ্রদ্ধা: একটি ভারত যা শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী এবং সংবেদনশীল। দেশের তরুণদের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে তারা এই লক্ষ্য অর্জনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে এবং এই সংকল্পকে বাস্তবে পরিণত করতে পূর্ণ শক্তি দিয়ে কাজ করবে।"


