মাঝ আকাশে ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে ভয়াবহ হামলা। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শত শত যাত্রীর প্রাণ বাঁচালেন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছর। তাঁর এই সাহসিকতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বৃহস্পতিবার ফ্লাইদুবাইয়ের (flydubai) ফ্লাইট FZ1073-এর ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরকে 'হিরো' বলে প্রশংসা করেছেন। ইজরায়েলগামী ওই বিমানে মাঝ আকাশে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও যাত্রীদের বাঁচাতে তিনি যে সাহস দেখিয়েছেন, তার জন্যই মোদী তাঁকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর এই সাহসিকতার জন্যই শত শত প্রাণ বেঁচেছে এবং বড়সড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে।
এক্স (X) হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে প্রধানমন্ত্রী মোদী লেখেন, "ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছর একজন হিরো। চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে এবং নিজে গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি অন্যদের জীবন বাঁচাতে যে অদম্য সাহস আর সংকল্প দেখিয়েছেন তা অভাবনীয়। তাঁর এই সাহসিকতা শত শত মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে এবং একটি বড় দুর্ঘটনা রুখে দিয়েছে।"
তিনি আরও লেখেন, "ক্যাপ্টেন মাচ্ছরকে নিয়ে ভারত গর্বিত। আমি তাঁর দ্রুত আরোগ্য, শক্তি এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।"
ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছর একজন হিরো: নরেন্দ্র মোদী
চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে এবং নিজে গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি অন্যদের জীবন বাঁচাতে যে অদম্য সাহস আর সংকল্প দেখিয়েছেন তা অভাবনীয়। তাঁর এই সাহসিকতা শত শত মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে এবং একটি বড় দুর্ঘটনা রুখে দিয়েছে। ক্যাপ্টেন মাচ্ছরকে নিয়ে ভারত গর্বিত…
ঘটনাটি ঘটে দুবাই থেকে তেল আভিভগামী একটি ফ্লাইটে। অভিযোগ, কো-পাইলট হঠাৎই ক্যাপ্টেন মাচ্ছরকে ছুরি মারেন এবং বিমানটিকে ক্র্যাশ করানোর চেষ্টা করেন।
গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন মাচ্ছর ককপিটের দরজা আনলক করতে সক্ষম হন। এর ফলে যাত্রীরা এবং বিমানে থাকা অন্য ক্রুরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে আটকে ফেলেন। এরপর বিমানটির গতিপথ ঘুরিয়ে সৌদি আরবে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করানো হয়।
সিবিএস নিউজ (CBS News) জানিয়েছে, মাঝ আকাশে এই ধস্তাধস্তির সময় বিমানটি যখন হঠাৎ নিচে নামতে শুরু করে, তখন যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
যাত্রী আলমোগ ইতালি তাঁর একটি ভিডিওতে বলেন, "হঠাৎ করেই বিমানটা নিচে নামতে শুরু করে। ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি হয়। তারপর একটু ঠিক হয়, আবার ১০ সেকেন্ডের জন্য নিচে নামতে থাকে। এরপর আমরা দেখি, বিমানের সামনের দিকে রীতিমতো দাঙ্গা বেধে গেছে।"
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কথা উল্লেখ করে সিবিএস নিউজ আরও জানিয়েছে, "ছুরি মারার ঘটনার পর যাত্রীরা ওই কো-পাইলটকে চেপে ধরেন। আর বিমানে থাকা অন্য একজন পাইলট সৌদি আরবে বিমানটিকে নিরাপদে নামিয়ে আনেন।"
সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার কথা স্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, "ফ্লাইট ডেকে একটা গণ্ডগোল হয়েছিল।" তবে বিমানে থাকা অফ-ডিউটি ফ্লাইদুবাই ক্রুরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং বিমানটিকে নিরাপদে অবতরণ করান।
পরে অন্য একটি বিমানে করে যাত্রীদের তেল আভিভে নিয়ে যাওয়া হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্যাপ্টেন মাচ্ছরের প্রশংসা করেছেন। এই ঘটনা নিয়ে কথা বলার সময় তিনি তাঁকে 'হিরো' আখ্যা দেন। ট্রাম্প জানান, তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই কো-পাইলটকে তিনি "হয়তো কোনও সন্ত্রাসী বা পাগল" বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্প বলেন, "পাইলটের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। কিন্তু দরজা খুলে দিয়ে তিনি সত্যিই একজন হিরোর কাজ করেছেন।"
এই ঘটনায় ইজরায়েলি যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুনের সাহসিকতারও প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। তাঁর এই পদক্ষেপকে তিনি "অসাধারণ" বলেছেন।
পরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করেন হায়ুন। তিনি জানান, কীভাবে তিনি হামলাকারীর গলা চেপে ধরে তাকে ককপিট থেকে টেনে বের করেন এবং তারপর ফিরে গিয়ে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন।
নেতানিয়াহু হায়ুনকে "আসল হিরো" বলে উল্লেখ করে এক্স-এ লেখেন, "ইয়ানিভ, তুমি একজন সত্যিকারের হিরো। আমরা সিংহহৃদয় জাতি!"
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের সেক্রেটারি মার্কওয়েইন মুলিন জানিয়েছেন, এই ঘটনার পর আমেরিকার জন্য "বিশ্বাসযোগ্য কোনও হুমকি" নেই। এভিয়েশন সিকিউরিটি আধিকারিকরা বর্তমান নিরাপত্তা প্রোটোকলগুলো খতিয়ে দেখছেন।
ফক্স নিউজ (Fox News) জানিয়েছে, বুধবার (স্থানীয় সময়) মুলিন বলেন, "এই মুহূর্তে আমাদের জন্য কোনও বড় বিপদের খবর নেই। আমরা এই ধরনের প্রতিটি ঘটনাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখি। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, তা আমরা সবসময় নজরে রাখি যাতে আমেরিকার মানুষ সুরক্ষিত থাকে।"
ফ্রান্সে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসও ক্যাপ্টেন মাচ্ছরের "অসাধারণ সাহসিকতার" প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। তারা বলেছে, ছুরি খাওয়ার পরও তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন, ককপিটের দরজা খুলে দিয়েছেন এবং যাত্রীদের সাহায্যে হামলাকারীকে কাবু করেছেন। এর ফলে মাঝ আকাশে বড়সড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে এবং ১৭৪ জনের প্রাণ বেঁচেছে।
ইজরায়েলের বিদেশ মন্ত্রকও মাচ্ছরকে হিরো বলে সম্মান জানিয়েছে। তারা বলেছে, গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি ককপিটের দরজা খুলে দিয়ে ইজরায়েলি যাত্রী এবং এমিরেতি ক্রুদের ভেতরে ঢোকার সুযোগ করে দেন।
এক্স-এ একটি পোস্টে তারা লিখেছে, "এই মানুষটি একজন হিরো। ফ্লাইদুবাই ফ্লাইট ১০৭৩-এর ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছর ককপিটে ছুরি খাওয়ার পরও লড়াই করেছেন। গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি ককপিটের দরজা আনলক করেন। এর ফলে ইজরায়েলি যাত্রী এবং এমিরেতি ক্রুরা ভেতরে ঢুকে সবাইকে বাঁচাতে পেরেছেন। তাঁদের সবার অসাধারণ সাহসিকতায় ১৭৪ জনের প্রাণ বেঁচেছে। ভারতীয়, ইজরায়েলি, এমিরেতি— আলাদা আলাদা দেশ, কিন্তু সাহসিকতার এক অসাধারণ নজির। আমরা ক্যাপ্টেন মাচ্ছরের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।"
ভারতে নিযুক্ত ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজারও মাচ্ছরের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন এবং বিমানে থাকা সবার যৌথ প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন।
এক্স-এ আজার লেখেন, "ইজরায়েলি, ভারতীয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির নাগরিকদের সঙ্গে মিলে আমি ফ্লাইদুবাই ফ্লাইট FZ1073-এর অভিজ্ঞ এবং সাহসী ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরের জীবনের জন্য প্রার্থনা করছি। তাঁর এবং অন্যান্য ইজরায়েলি ও এমিরেতি যাত্রী ও ক্রুদের সাহসিকতায় ১৮০ জনের প্রাণ বেঁচেছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমরা একজোট!"
ইজরায়েলে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, আহত হওয়া সত্ত্বেও মাচ্ছর "অসাধারণ সাহস, স্থিরতা এবং কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা" দেখিয়েছেন।
দূতাবাস বলেছে, "ফ্লাইট FZ1073-এর সাহসী ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরকে স্যালুট! এমন একটা কঠিন পরিস্থিতিতে আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি যে সাহস আর কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা দেখিয়েছেন, তা সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য আমরা প্রার্থনা করছি।"
আমেরিকায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় মোহন কোয়াত্রাও পাইলটের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন।
এক্স-এ কোয়াত্রা লেখেন, "আকাশের বুকেও সাহসের জয় হলো। আমরা ফ্লাইট FZ1073-এর সাহসী ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরকে স্যালুট জানাই। তিনি বিমানে থাকা সাহসী মানুষদের সঙ্গে মিলে একটা বড় বিপর্যয় রুখে দিয়ে নিরাপদে বিমান নামিয়েছেন। তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য আমরা প্রার্থনা করছি।"
ক্যাপ্টেন মাচ্ছর একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ পাইলট। তিনি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-ভিত্তিক বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাইয়ে ডিরেক্ট-এন্ট্রি ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করছেন।
কমার্শিয়াল এভিয়েশনে তাঁর ১৩ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর মোট ফ্লাইং আওয়ার ৯,৭৫০ ঘণ্টা, যার বেশিরভাগই বোয়িং ৭৩7 (B737) বিমানে।
ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ভারতীয় বিমান সংস্থা স্পাইসজেটে (SpiceJet) ১১ বছর কাজ করেছেন। সেখানে তিনি লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
এদিকে, সিএনএন (CNN) জানিয়েছে, বুধবারের এই মাঝ আকাশের ঘটনার তদন্ত চলাকালীন ফ্লাইদুবাই সাময়িকভাবে ইজরায়েলে তাদের সমস্ত উড়ান বাতিল করেছে বলে সংস্থার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন।


