- Home
- India News
- Right to Protest: বিক্ষোভ দেখানো মানেই কি গ্রেফতার? কী বলছে সংবিধান, কী বলছে আইন? জেনে নিন এক ক্লিকে
Right to Protest: বিক্ষোভ দেখানো মানেই কি গ্রেফতার? কী বলছে সংবিধান, কী বলছে আইন? জেনে নিন এক ক্লিকে
ভারতে কি প্রতিবাদ করাটা আপনার মৌলিক অধিকার? ধরনা বা বিক্ষোভ করলে কি পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে? প্রতিবাদ নিয়ে ভারতের সংবিধান, পুলিশের আইনকানুন, ১৯ নম্বর ধারার নিয়ম, পুলিশের ক্ষমতা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় সম্পর্কে সহজ ভাষায় জেনে নিন।

দেশের রাজধানী দিল্লি এখন প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল। এই বছরের মে মাসে হওয়া NEET-UG পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। এই ঘটনার পর অন্তত ২১ জন ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। গত মাসের শেষে পুনর্পরীক্ষা হলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে শুরু হওয়া 'ককরোচ জনতা পার্টি' (CJP)-র নেতৃত্বে হাজার হাজার যুবক দিল্লির যন্তর মন্তরে 'সংসদ মার্চ' করে।

তাদের দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। পুলিশ তাদের আটকাতে লাঠিচার্জ করে, যা নিয়ে বিরোধীরা সরব হয়েছে। অন্যদিকে, পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, তেলেঙ্গানা এবং তামিলনাড়ুর হাজার হাজার কৃষক মঙ্গলবার 'কিষাণ ঘাট'-এ মহাপঞ্চায়েত করে।
তাদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি দেশের কৃষি ও দুগ্ধ শিল্পকে ধ্বংস করে দেবে। কৃষকদের আটকাতে পুলিশ দিল্লির সীমানা বন্ধ করে দেয়। এই সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে প্রতিবাদ করার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আইনত এর সীমা কতটা? পুলিশের ক্ষমতাই বা কী?
ভারতের সংবিধানে সরাসরি 'প্রতিবাদ করার অধিকার'-এর কথা আলাদা করে লেখা নেই। তবে সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার জানিয়েছে, এটি আসলে ধারা ১৯-এর অধীনে একটি মৌলিক অধিকার। ধারা ১৯(১)(ক) নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়। এর মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা বা জনমত তৈরি করার সুযোগ পাওয়া যায়। ধারা ১৯(১)(খ) অনুযায়ী, নাগরিকরা অস্ত্র ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে একত্রিত হওয়ার অধিকার পান। আবার ধারা ১৯(১)(গ) অনুযায়ী, সমিতি বা ইউনিয়ন তৈরির স্বাধীনতা রয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের (UNHRC) ৪৭তম অধিবেশনে ভারতের প্রতিনিধি পবন কুমার বধে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অহিংস মিছিলই ছিল প্রধান অস্ত্র, তাই সংবিধানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।ভারতে প্রতিবাদের অধিকার অসীম নয়। সংবিধানের ধারা ১৯(২) এবং ১৯(৩) অনুযায়ী, কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা নৈতিকতা রক্ষা করার জন্য এই বিধিনিষেধগুলো কার্যকর করা হয়। বিশেষ করে, বিক্ষোভকারীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য সরকারি রাস্তা বা সড়ক অবরোধ করতে পারে না। জনগণের চরম অসুবিধা সৃষ্টি করাও বেআইনি।
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং আইন অমান্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আইনের আওতায় অনুমতির সাথে হয়। কিন্তু আইন অমান্য মানে জেনেশুনে কার্ফু বা আইন লঙ্ঘন করা। সেক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়। এছাড়াও, ধারা ৫১এ অনুযায়ী, প্রতিবাদের সময় সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা এবং হিংসা থেকে দূরে থাকা নাগরিকদের মৌলিক কর্তব্য।
রাস্তায় বা প্রকাশ্য স্থানে সভা-সমাবেশ করার জন্য পুলিশের অনুমতি বাধ্যতামূলক। ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক 'হিম্মত লাল কে শাহ বনাম পুলিশ কমিশনার' মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এই রায় দেয়। আদালত জানায়, এটি অধিকার খর্ব করা নয়, বরং ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি পরিষেবার পথ খোলা রাখার জন্য এই নিয়ম। তাই বিক্ষোভকারীদের সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হয়। জনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সরকার কিছু বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে।
ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS)-র ১৬৩ ধারা (পুরনো CrPC-র ১৪৪ ধারা) অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন। এই আদেশে সংবেদনশীল এলাকায় ৫ বা তার বেশি লোকের জমায়েত বা মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র ২২৩ ধারা অনুযায়ী শাস্তি হতে পারে। পুলিশ জনশৃঙ্খলার ভঙ্গের আশঙ্কায় বিক্ষোভকারীদের 'প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন' বা আগাম আটক করতে পারে। তবে, ধারা ২২ অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির কারণ জানার অধিকার এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হওয়ার মতো সুরক্ষা কবচ রয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা হিংসাত্মক হয়ে উঠলে বা নিষিদ্ধ এলাকার (যেমন পার্লামেন্ট মার্গ) দিকে এগোলে, পুলিশ আইনি প্রক্রিয়া মেনে বলপ্রয়োগ করতে পারে। প্রথমে সেই জমায়েতকে 'বেআইনি সমাবেশ' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ডিউটি ম্যাজিস্ট্রেট বা সাব-ইন্সপেক্টর পদের কোনো অফিসার লাউডস্পিকারে толпуকে শান্তিপূর্ণভাবে চলে যেতে বলেন। সেই সতর্কবার্তা না মানলে, জনশৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ 'ন্যূনতম বলপ্রয়োগ' করতে পারে।
এর জন্য পর পর কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়:
• প্রথম ধাপ: জলকামান ব্যবহার করা।
• দ্বিতীয় ধাপ: কাঁদানে গ্যাস ছোড়া।
• শেষ উপায়: এই সব ব্যর্থ হলে তবেই লাঠিচার্জ করা হয়।
লাঠিচার্জের সময় শরীরের সংবেদনশীল অংশ, যেমন মাথা বা কলারবোনে আঘাত না করার কঠোর নিয়ম রয়েছে।
গণতন্ত্রে প্রতিবাদ এবং ভিন্নমতের গুরুত্বকে সুপ্রিম কোর্ট বারে বারে সমর্থন করেছে।
• রামলীলা ময়দান মামলা (২০১২): আদালত স্পষ্ট করে যে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার এবং সরকার উপযুক্ত কারণ ছাড়া তা আটকাতে পারে না।
• এনজিটি-র নির্দেশ (২০১৭): দিল্লির যন্তর মন্তরে তীব্র শব্দ দূষণ এবং স্থানীয়দের অসুবিধার কারণে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT) সেখানে প্রতিবাদ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে।
• মজদুর কিসান শক্তি সংগঠন (২০১৮): আদালত নির্দেশ দেয়, প্রতিবাদের অধিকার সকলেরই আছে, তবে যন্তর মন্তর বা রামলীলা ময়দানের মতো নির্দিষ্ট জায়গায় বিক্ষোভ করার জন্য নিয়ম তৈরি করতে হবে।
• শাহিন বাগ / অমিত সাহনি মামলা (২০২০): সর্বোচ্চ আদালত জানায়, প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও এর নামে অনির্দিষ্টকালের জন্য সরকারি রাস্তা বা সড়ক অবরোধ করা যায় না। বিক্ষোভ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। সুতরাং, ভারতে প্রতিবাদের অধিকার গণতন্ত্রের একটি স্তম্ভ। তবে এই অধিকার শান্তিপূর্ণ, আইনসম্মত এবং অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করে ব্যবহার করলেই সাংবিধানিক সুরক্ষা পায়।

