কিরানা হিলসকে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পরমাণু পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত এলাকা হিসেবে দেখা হয়। ফলে সেখানে ভারতীয় ড্রোনের বিস্ফোরণের ঘটনায় তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন।
গত বছর অপারেশন সিঁদুর চলাকালীন পাকিস্তানের কিরানা হিলসে ভারতীয় একটি ড্রোন গিয়ে পড়ার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছিল। কিরানা হিলসকে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পরমাণু পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত এলাকা হিসেবে দেখা হয়। ফলে সেখানে ভারতীয় ড্রোনের বিস্ফোরণের ঘটনায় তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। এবার সেই ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেন প্রাক্তন চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ (সিডিএস) জেনারেল অনিল চৌহান।
দিল্লির বিবেকানন্দ কেন্দ্রে মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান, কিরানা হিলসকে লক্ষ্য করে ভারত কোনও পরিকল্পিত হামলা চালায়নি। সেখানে ভারতীয় ড্রোনের গিয়ে পড়ার ঘটনা ছিল মূলত অনিচ্ছাকৃত। শত্রুপক্ষের রাডার খুঁজতে গিয়ে ড্রোনটির জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়াতেই সেটি পাহাড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ে বলে জানান তিনি।
কিরানা হিলসকে নিশানা করার পরিকল্পনা ছিল না
জেনারেল অনিল চৌহান জানান, অপারেশন সিঁদুরের সময় সরগোধা এবং কিরানা হিলসের আশপাশে একাধিক ড্রোন পাঠানো হয়েছিল। এই ড্রোনগুলির মূল কাজ ছিল পাকিস্তানের রাডার ব্যবস্থা খুঁজে বের করা। কিরানা হিলসকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিয়ে কোনও হামলার পরিকল্পনা ছিল না।
তিনি তৎকালীন এয়ার মার্শাল এ কে ভারতীর বক্তব্যকেও সমর্থন করেন। তাঁর কথায়, কিরানা হিলসকে লক্ষ্য করে ভারতীয় বাহিনীর কোনও পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ হয়নি।
জ্বালানি শেষ হতেই পাহাড়ে আছড়ে পড়ে ড্রোন
প্রাক্তন সিডিএসের বক্তব্য অনুযায়ী, যে ভারতীয় ড্রোনটি কিরানা হিলসে গিয়ে পড়েছিল সেটি সম্ভবত ইজরায়েলে তৈরি ‘হারোপ’ ধরনের ড্রোন। এই ড্রোনগুলি নির্দিষ্ট সময় ধরে আকাশে চক্কর দিয়ে শত্রুপক্ষের রাডার বা সামরিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার চেষ্টা করে।
কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনও লক্ষ্য খুঁজে না পেলে ড্রোনটির জ্বালানি শেষ হয়ে যেতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে সেটি আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। কিরানা হিলসের ঘটনাতেও এমনটাই হয়েছিল বলে জানান জেনারেল চৌহান। আকাশে ঘোরার সময় জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর ড্রোনটি পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বিস্ফোরিত হয়। অর্থাৎ কিরানা হিলসে ড্রোন পড়ার ঘটনা কোনও পরিকল্পিত হামলার ফল নয়, বরং সামরিক অভিযানের সময় ঘটে যাওয়া একটি অনিচ্ছাকৃত ঘটনা।
স্কার্দুতে হামলার অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল
অপারেশন সিঁদুর নিয়ে বলতে গিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আনেন প্রাক্তন সিডিএস। তিনি জানান, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের স্কার্দুতে হামলা চালানোর জন্য ভারতীয় বায়ুসেনাকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বায়ুসেনার প্রধান সরগোধায় হামলার অনুমতি চাইলে তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে আরও দুটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বেছে নিতে বলা হয়েছিল। সেই তালিকায় স্কার্দুও ছিল।
খারাপ আবহাওয়ায় বদলে যায় পরিকল্পনা
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলেও শেষ মুহূর্তে আবহাওয়া বাধা হয়ে দাঁড়ায়। স্কার্দু এলাকায় ঘন কুয়াশা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেখানে অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। ফলে ভারতীয় বায়ুসেনাকে শেষ মুহূর্তে নিজেদের পরিকল্পনা বদলাতে হয়। স্কার্দুর বদলে ভোলাড়িকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলে এই অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে জানান জেনারেল চৌহান।
ভোলাড়িতে নিখুঁত হামলা
১০ মে-র সামরিক অভিযানে ভোলাড়িতে চালানো হামলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতীয় বায়ুসেনার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বায়ুসেনা কমান্ডের মাধ্যমে এই হামলা চালানো হয়েছিল বলে জানা যায়। হামলার পর উপগ্রহ চিত্রে ভোলাড়ির ক্ষয়ক্ষতির ছবিও সামনে আসে। সেখানে দেখা যায়, একটি বিমান রাখার হ্যাঙ্গারের শক্তিশালী ছাদ ভেঙে ভিতরের দিকে ঢুকে পড়েছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় হ্যাঙ্গারের ধ্বংসাবশেষ এবং অন্যান্য অংশ রানওয়ে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
আশপাশের বাড়ি ছিল অক্ষত
এই হামলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর নির্ভুলতা। উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায়, মূল লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও আশপাশের একাধিক বাড়ি তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল। এর থেকেই ভারতীয় বায়ুসেনার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলার বিষয়টি সামনে আসে।
প্রাক্তন সিডিএসের বক্তব্যে অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারতের সামরিক পরিকল্পনার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। কিরানা হিলসে ড্রোন পড়ার ঘটনা যেমন পরিকল্পিত হামলা ছিল না, তেমনই স্কার্দুর প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শেষ মুহূর্তে লক্ষ্য পরিবর্তনের ঘটনাও দেখায়, পরিস্থিতি অনুযায়ী কীভাবে দ্রুত সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

