পৃথিবীর জুড়ে মহামারীর আকারে ছড়িয়েছে মারণ করোনা ভাইরাস। যেকোন উপায়ে ভ্যাকসিন ও ওষুধ আবিষ্কার করতে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। এই অবস্থা আশা জাগিয়েছিল করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসায় প্রথম তৈরি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ রেমডেসিভির। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করোনার পরীক্ষামূলক ওষুধ ‘রেমডেসিভির’গ্রহণকারী রোগীরা দ্রুত সুস্থ হচ্ছেন বলে দাবি করেছিলেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। করোনা সারাতে বেশ কাজে আসবে রেমডেসিভির, এমনটাই আশা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু ধাক্কাটা এল প্রথম পরীক্ষার পরেই। করোনা রোগীদের শরীরে রেমডেসিভির ওষুধের প্রথম ট্রায়াল ব্যর্থ হয়েছে বলে সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা 'হু'-এর ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পায়।

‘রেমডেসিভির’ নিয়ে  'হু'-এর  প্রতিবেদন জানানো হয়েছিল, চিনে হওয়া পরীক্ষায় দেখা গেছে, রেমডেসিভির করোনায় আক্রান্ত রোগীদের উন্নতিতে কাজ করেনি এবং রক্তপ্রবাহে প্যাথোজেনের উপস্থিতি হ্রাস করতে পারেনি। এই রিপোর্ট প্রকাশ পেতেই  গোটা দুনিয়া জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়  ওষুধটি উৎপাদনকারী মার্কিন সংস্থা  গিলিড সায়েন্সেস। সংস্থা কর্তৃপক্ষ দাবি করে , বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নথিতে গবেষণাটিকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। এদিকে প্রতিক্রিয়া তৈরি হতেই নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে ওষুধটির ব্যর্থতার ব্যাপারে দেওয়া তথ্য সরিয়ে ফেলে 'হু'। এরপরেই বিশ্বা স্বাস্থ্য সংস্থা দাবি করে,  ভুলবশত ওই খসড়াটি প্রকাশ করা হয়েছিল।

করোনা যুদ্ধ জিতে নজির গড়ে বাড়ি ফিরলেন ৯২ বছরের বৃদ্ধা, হেরে গেল ৪ মাসের ছোট্ট শিশু

করোনা যুদ্ধে সামিল দেশের ফার্স্ট লেডিও, গরিবদের জন্য মাস্ক বানাচ্ছেন সবিতা কোবিন্দ

মহামারীতে তছনছ বিশ্ব, করোনাভাইরাস কী জানেনই নাকি এই বিশ্বভ্রমণে বেরোন দম্পতি

'হু'-এর প্রকাশ করা প্রতিবেদনে প্রথমে দাবি করা হয়,  ২৩৭ জন রোগীর উপরে ট্রায়াল করে দেখা হয়েছে এই ওষুধ। ১৫৮ জনকে রেমডেসিভির খাইয়ে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল, বাকি ৭৯ জনকে ওষুধ খাওয়ানো হয়নি। দেখা গেছে, রেমডেসিভির যারা খেয়েছিলেন তাদের শারীরিক অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। আবার ১৮ জন রোগীর মধ্যে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে।

রেমডেসিভির ওষুধের নির্মাতা সংস্থা গিলেড সায়েন্স দাবি করেছে,  ৫৫০০ রোগীর উপরে এই ওষুধের ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে। সেই ট্রায়ালের রিপোর্ট সামনে আনেনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য এখনও পর্যন্ত বিশ্বে সেভাবে কোনও অনুমোদিত ওষুধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কার্যকরী ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউটস অব হেলথও বেশ কয়েকটি ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে। এরই একটি হলো রেমডেসিভির ওষুধ। গিলেড সায়েন্সেস-এর তৈরি এ ওষুধটি ইবোলার বিরুদ্ধে পরীক্ষা করা হলেও এতে সাফল্য এসেছিলো সামান্যই। তবে বিভিন্ন পশুর শরীরে চালানো বেশ কয়েকটি পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে কোভিড-১৯, সার্স ও মার্সসহ করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত সংক্রমণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় এই ওষুধ কার্যকরী। ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, রেমডেসিভির ওষুধটির করোনায় কাজ করার সম্ভাবনা আছে। এরপরেই  মানুষের শরীরে এই ওষুধটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।

২০১০ সালে এই অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ তৈরি করে গিলেড সায়েন্সস। তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছিল, রেমডেসিভির  নিউক্লিওটাইড অ্যানালগ।  চারজন করোনা আক্রান্ত রোগীর উপর এই ড্রাগের প্রভাব কার্যকরী হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছিল সংস্থার পক্ষ থেকে। যদিও তখনই এই ওষুধ ব্যবহারে সবুজ সঙ্কেত দিতে পারেনি গিলেড সায়েন্সেস। পরে, নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে একটি গবেষণার রিপোর্টে বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, রেমডেসিভির ভাইরাসের বৃদ্ধি ও বিস্তার আটকাতে পারে। ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা সঙ্কটাপন্ন রোগীদের উপরেও কাজ করতে পারে এই ড্রাগ।

 করোনা মোকাবিলায় মানবদেহে  পরীক্ষামূলক ভাবে  রেমডেসিভির দেওয়া হয়েছিল ইন্ট্রাভেনাস পদ্ধতিতে। এই ওষুধের পরীক্ষা গোটা বিশ্বেই করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আশা জাগিয়েছিল। সেই আশাতেই সিপলা, গ্লেনমার্ক, ডক্টর রেড্ডির মতো ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিও এই ওষুধ তৈরির জন্য প্রাথমিক প্রক্রিয়াও শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু  হু-এর প্রকাশ রিপোর্টে সেই  উদ্যোগেও প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে গেল।