বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আবহে বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে ভারতের নিরাপত্তা, কানেক্টিভিটি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তার একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ভারতের জন্য এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন—আগামী নির্বাচনে বিএনপি না জামায়াত, কাদের জয় দিল্লির কৌশলগত স্বার্থের অনুকূলে হবে?
বিএনপি এবং ভারতের পুরনো ও নতুন রসায়ন:
ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুব একটা মসৃণ ছিল না। ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত দেওয়া এবং ভারত-বিরোধী মনোভাবের কারণে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি অনেকটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ভারতকে এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে, তারা ক্ষমতায় এলে ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি এমন কোনো কাজ হতে দেবে না। ভারতের জন্য বিএনপি একটি 'সেকুলার' বা অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি তারা তাদের পুরনো উগ্রপন্থা পরিহার করে।
জামায়াতে ইসলামী:
দিল্লির আশঙ্কার কেন্দ্র: অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ভারতের উদ্বেগ চিরকালীন। জামায়াতের আদর্শিক অবস্থান এবং তাদের কট্টরপন্থী মনোভাব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে দিল্লির নীতি-নির্ধারকরা মনে করেন। এছাড়া জামায়াতের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ভারতকে সর্বদা সতর্ক রাখে। জামায়াত এককভাবে বা শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান ঘটতে পারে, যা ভারতের 'প্রতিবেশী প্রথম' (Neighborhood First) নীতির জন্য অন্তরায় হতে পারে।
ভারতের মূল লক্ষ্য:
নিরাপত্তা ও কানেক্টিভিটি: ভারতের জন্য বাংলাদেশে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
১. নিরাপত্তা: উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে ঢাকার পূর্ণ সহযোগিতা।
২. কানেক্টিভিটি: ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
৩. সংখ্যালঘু সুরক্ষা: বাংলাদেশে হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
লাভ-ক্ষতির বিচার:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি 'লাভ' বা 'ক্ষতি'র তুলনায় ভারত এখন 'ব্যালেন্স' বা ভারসাম্য রক্ষার নীতিতে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ পরবর্তী সময়ে ভারত চাইবে এমন একটি সরকার, যারা উগ্রপন্থাকে প্রশ্রয় দেবে না। এই বিচারে বিএনপি যদি জামায়াতের প্রভাবমুক্ত হয়ে এককভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকে, তবে ভারতের পক্ষে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করা সহজ হতে পারে। জামায়াতের অত্যধিক প্রভাব ভারতের জন্য সবসময়ই অস্বস্তিকর।
ভারতের লাভ কোনো নির্দিষ্ট দলের জয়ে নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ও বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশের মধ্যে নিহিত। বিএনপি যদি তাদের ভারত-নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে এবং জামায়াতের উগ্রপন্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে তা দিল্লির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত এখন সব পক্ষের সঙ্গেই আলোচনার পথ খোলা রাখছে।
আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


