বাংলাদেশ বর্তমানে এক ভয়াবহ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অত্যধিক লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার শপিং মল, দোকানপাট ও বাজারগুলো রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে এক ভয়াবহ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অত্যধিক লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার শপিং মল, দোকানপাট ও বাজারগুলো রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। বিদ্যুৎ সঙ্কটের তীব্রতায় ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্প খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের জন্য ভারতের দ্বারস্থ হয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার বাইরের গ্রামীণ এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সঙ্কটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে, যেখানে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। তীব্র গরম ও চলমান তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিদ্যুতের চাহিদা যেখানে প্রায় ১৮,০০০ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ ১৩,০০০ মেগাওয়াটের গণ্ডি পার করতে হিমশিম খাচ্ছে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা

'ঢাকা ট্রিবিউন'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিনের পর দিন ধরে চলা অত্যধিক লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে 'বাংলাদেশ পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি' গ্রিড, সাব-স্টেশন ও বিদ্যুৎ অফিসের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের সহায়তা চাইতে বাধ্য হয়েছে। গত কয়েক দিনে স্থানীয় থানাগুলোতে বিদ্যুৎ সমবায় সমিতিগুলোর পক্ষ থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ মোতায়েন ও নিয়মিত রাতের টহলের ব্যবস্থা করা হয়। নীলফামারীর সৈয়দপুর এবং কুষ্টিয়ায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

কিছু এলাকায় বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায়ের অভিযানের সময় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। 'ডেইলি স্টার'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেত্রকোনায় কর্মীরা অফিস ভাঙচুরের হুমকির পাশাপাশি বিরূপ বা আক্রমণাত্মক ফোন কল পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাহলে, সাম্প্রতিক এই সঙ্কটের মূল কারণ কী?

বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান কারণ হল জ্বালানি, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় তেলের ৯০ শতাংশেরও বেশি এবং গ্যাসের ৩০ শতাংশ আমদানি করে থাকে। সাম্প্রতিক এই সঙ্কট মূলত দুটি ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গত মাসে মার্কিন কোম্পানি 'এক্সিলারেট এনার্জি'-র মালিকানাধীন একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর এলএনজি (LNG) সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসে। ২১ জুলাইয়ের ওই দুর্ঘটনার পর টার্মিনালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকেই এর আংশিক কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, 'ডেইলি স্টার'-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমুদ্রের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে অন্তত দুটি এলএনজি (LNG)বাহী জাহাজ টার্মিনালে তাদের পণ্য খালাস করতে পারেনি। এছাড়া, আমদানিকৃত বিদ্যুতের সরবরাহও কমে গেছে, যার ফলে লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা বেড়েছে।

সারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে ৬টি কোম্পানি। বর্তমানে ঢাকা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ঢাকার বাইরে গ্রামীণ এলাকায় ৮০টি সমবায় সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য প্রতিদিন ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ঘনফুটেরও বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে ৭০ কোটি (৭০০ মিলিয়ন) ঘনফুট। এর ফলে সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর, সিলেট, রাজশাহী এবং খুলনা অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের এই সমস্যা প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে। অধিকাংশ এলাকায় প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। খুলনায় স্থানীয়রা ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।

ব্যবসায়ী ও কৃষকদের উপর বিরূপ প্রভাব

দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে কৃষি কাজ, রেস্তরাঁ চালানো এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির কারণে কৃষকদের ডিজেলচালিত জেনারেটরের পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চিংড়ি চাষিরা। চিংড়ি চাষি পবিত্র রায় 'ডেইলি স্টার'-কে বলেন, "যখনই কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ চলে যায়, আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। তখন জলের অক্সিজেন বাড়ানোর যন্ত্রগুলো (অ্যারেটর) অচল হয়ে পড়ে, জলে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং চিংড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।"

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতও এই সঙ্কটের মুখে পড়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির কোনও লক্ষণ না থাকায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বুধবার সরকার নির্দেশ দিয়েছে যে, সব শপিং মল, বাজার এবং দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। সারা দেশে সব ধরনের বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে হবে। আলোকসজ্জার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব বিলবোর্ড বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে হাসপাতাল ও ফার্মেসিগুলোকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ ভারতের কাছে অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে ভারতের তৎকালীন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। সাংবাদিকদের মাহমুদ বলেন, "ভারতের সঙ্গে আমাদের একটি পাইপলাইন রয়েছে যার মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। আমরা তাদের কাছে আরও বেশি ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছি।" শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১৭ সালে চালু হওয়া 'ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন' বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা চলাকালীন মার্চ ও এপ্রিল মাসে ভারত ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে ৩০ হাজার টনেরও বেশি ডিজেল পাঠিয়েছে।