তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর ভাটির দিকে ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে চিন। এই বিশাল প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নয়াদিল্লিতে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ইয়ারলুং সাংপো নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। এটি অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং সেখানে 'সিয়াং' নদী নাম ধারণ করে।
তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর ভাটির দিকে ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে চিন। এই বিশাল প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নয়াদিল্লিতে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় সংস্থাগুলোর পর্যালোচনা করা গোয়েন্দা তথ্য এবং স্যাটেলাইট চিত্র থেকে জানা যায় যে আন্তঃসীমান্ত নদীতে এ ধরনের বিশাল বাঁধ নির্মাণের ফলে ভাটির অঞ্চলে যে প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ সত্ত্বেও এই নির্মাণকাজ বেশ জোরকদমে এগিয়ে চলেছে।

ইয়ারলুং সাংপো নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। এটি অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং সেখানে 'সিয়াং' নদী নাম ধারণ করে। এরপর এটি আসামে প্রবেশ করে 'ব্রহ্মপুত্র' হিসেবে প্রবাহিত হয়, যা ভারতের কোটি কোটি মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলধারা। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্তারা জানিয়েছেন যে, ভারত সরকার এই প্রকল্পটির উপর নিবিড় নজর রাখছে। বেইজিংয়ের তিব্বত-কেন্দ্রিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে এই নির্মাণকাজকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে নয়াদিল্লি। তবে এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এল যখন ভারতীয় কর্তারা এ ধরনের প্রকল্পের ভাটির দিকের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চলেছেন এবং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে নদীর উপর বিশাল বাঁধ নির্মাণের ফলে জলের স্বাভাবিক প্রবাহ ও পলি পরিবহনের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে, পরিবেশগত ক্ষতি হতে পারে এবং ভাটির দিকের অঞ্চলে বন্যার ধরনেও পরিবর্তন ঘটতে পারে।
বাঁধ নির্মাণের ফলে ভাটির দিকের প্রভাব ছাড়াও এর কৌশলগত দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর উজানে বিশাল সব বাঁধ থাকলে কোনও বিরোধের ক্ষেত্রে বেইজিং বাড়তি সুবিধা পাবে। কারণ এর মাধ্যমে তারা ওই অঞ্চলে জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। যদিও বেইজিংয়ের দাবি, তাদের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য হল বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এবং এর ফলে ভারত-সহ ভাটির দিকের দেশগুলোর কোনও ক্ষতি হবে না। তবে নয়াদিল্লি কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।
গত বছর সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং জানান যে, এই বিশাল বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরুর বিষয়ে আসা রিপোর্টগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের নজরে রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার কয়েক দশক ধরেই এই প্রস্তাবিত বিশাল বাঁধের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছে। ১৯৮৬ সালেই প্রকল্পটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে এবং তখন থেকেই চিনে এর প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রী আরও জানান যে, সরকার ব্রহ্মপুত্র নদ সংক্রান্ত সব ঘটনাপ্রবাহ—যার মধ্যে চিনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত—নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি আমাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ভাটির দিকের এলাকায় বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, ভারত বারবারই আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে চিনের কাছে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে এবং আন্তঃসীমান্ত নদী সংক্রান্ত সব বিষয় ২০০৬ সালে গঠিত 'বিশেষজ্ঞ-পর্যায়ের ব্যবস্থা'র (Expert Level Mechanism) মাধ্যমে আলোচনা করা হয়। সিং বলেন, “সরকার ধারাবাহিকভাবে চিনা সরকারের কাছে নিজেদের মতামত ও উদ্বেগের কথা জানিয়ে আসছে এবং তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন উজানের কোনও কর্মকাণ্ডের ফলে ভাটির দিকের রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না হয়।”
