আমেরিকা-ইরান শান্তি চুক্তির পরেই খেলা ঘুরিয়ে দিল তেহরান। একদিকে যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে নিজেদের আটকে থাকা সম্পত্তি, তেলের আয় আর হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণের মতো কড়া শর্ত চাপিয়েছে ইরান। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার আগেও নিজেদের দাবিদাওয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে তারা।
তেহরান/ওয়াশিংটন: আমেরিকা আর ইরানের মধ্যে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সই হওয়া 'ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং (MoU)' চূড়ান্ত হতেই বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে একদিকে যেমন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) খোলার পথ পরিষ্কার হয়েছে, তেমনই পর্দার আড়ালে দুই দেশের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র কূটনৈতিক লড়াই। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শান্তির বিনিময়ে তারা নিজেদের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে কোনও আপস করবে না।


'ডিজিটাল সই'-এর খেলা: চুক্তি ভাঙলে এবার চড়া দাম চোকাতে হবে!
ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সরকারি ব্রডকাস্টার IRIB-এর মাধ্যমে আমেরিকাকে সরাসরি সতর্ক করেছেন। বাঘাই নিশ্চিত করেছেন যে দুই দেশের রাষ্ট্রপতি এই ঐতিহাসিক নথিতে ডিজিটাল সই করেছেন, যার ফলে এটি এখন "সরকারিভাবে চূড়ান্ত"। কিন্তু আসল সাসপেন্স শুরু হয়েছে এরপর। বাঘাই কড়া ভাষায় বলেছেন, দুই রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমোদনের পর এখন এই চুক্তির কোনও লঙ্ঘন হলে তার পরিণাম আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর হবে এবং যে এমনটা করবে তাকে "চড়া দাম চোকাতে হবে"। তেহরানের এই কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে তারা ওয়াশিংটনের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর কড়া নজর রাখছে।

'পরমাণু ইস্যু' নিয়ে তেহরানের কৌশল: আগে যুদ্ধ শেষ, তারপর কথা!
এই গোটা চুক্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, ইরান এই পর্যায়ে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনও বড়সড় রফা করতে সরাসরি অস্বীকার করেছে। মুখপাত্র বাঘাই জানিয়েছেন যে, ইসলামিক রিপাবলিকের এটা একটা সুচিন্তিত কৌশল ছিল যে শুরুতে পরমাণু ইস্যু নিয়ে বেশি জলঘোলা না করা। ইরানের প্রথম লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ শেষ করা এবং সংঘাত থামানো, যা তারা সফলভাবে অর্জন করেছে। এখন আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (enrichment) সীমিত করা এবং নিষেধাজ্ঞা তোলার বিষয়ে আলোচনা হবে, যেখানে আমেরিকা যে কোনও মূল্যে ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা থেকে আটকাতে কড়া নিয়ম চাপানোর চেষ্টা করবে।

আটকে থাকা সম্পত্তি আর তেলের টাকা: আমেরিকাকে সব বাধা সরাতে হবে
নিজেদের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে ফের চাঙ্গা করতে ইরান আমেরিকার সামনে বেশ কিছু কড়া শর্ত রেখেছে। মেহের সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী, ইরানের সেন্ট্রাল ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার পর বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা ইরানের সম্পত্তি (Frozen Assets) ছাড়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। তেহরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের এই সম্পত্তিতে প্রবেশ এবং কোনও বাধা ছাড়াই তা ব্যবহার করার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এছাড়া, ইরান কোনও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়া নিজেদের তেল বিক্রি এবং তা থেকে হওয়া আয় স্বাধীনভাবে ব্যবহার করার দাবিতে জোর দিয়েছে, যার জন্য আমেরিকা বর্তমান বাধাগুলো সরানোর লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালীর নতুন নিয়ম: 'যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরবে না এই জলপথ'
এই চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সাসপেন্সে ভরা অংশটি হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি করিডোর—হরমুজ প্রণালী। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ সরকারি টেলিভিশনে লাইভ এসে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন। তিনি সাফ বলেছেন, "হরমুজ প্রণালী আর কখনও যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না।" চুক্তি অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজগুলির জন্য ৬০ দিনের টোল-ফ্রি সময় দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারপর ইরান এবং ওমান যৌথভাবে এই কৌশলগত জলপথের পরিচালনা করবে। ঘালিবাফ ঘোষণা করেছেন যে হরমুজের ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে এবং এরপর তারা সেখান দিয়ে যাওয়া পরিষেবার জন্য ট্রানজিট ফি (শুল্ক) আদায় করবে। যদিও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই বলেছেন যে তিনি এই পথে কোনও টোল মেনে নেবেন না, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সংঘাতের বীজ বপন করেছে।

মিসাইল নিয়ে কোনও আলোচনা নয়: 'আমাদের মিসাইল ছোড়ার জন্য, আলোচনার জন্য নয়!'
চুক্তির প্রথম ধারাতেই লেবাননের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করার কথা বলা হয়েছে, যাকে ইরান নিজেদের একটি বড় কূটনৈতিক জয় হিসেবে দেখছে। কিন্তু, ভবিষ্যতের আলোচনা নিয়ে ইরান তাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক সামরিক সীমারেখা টেনে দিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তাদের প্রতিরক্ষা এবং সামরিক ক্ষমতা কোনও আলোচনার টেবিলে আনা হবে না। মুখপাত্র বাঘাই অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলেছেন, "ইরানের মিসাইল ছোড়ার জন্য, আলোচনার জন্য নয়।" তেহরান তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং মিসাইল কর্মসূচি নিয়ে কোনও দেশ বা প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনওরকম আলোচনা করবে না। এই পরিস্থিতিতে, জেনেভায় আসন্ন বৈঠক শান্তি আনবে নাকি নতুন বিতর্ক, তা সময়ই বলবে।


