নেপাল, তার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত হলেও, গত এক দশকে বারবার প্রকৃতির রুদ্র রোষের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্প থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বন্যা, ভূমিধস ও হড়পা বান দেশের মানচিত্রকে বদলে দিয়েছে।

‘পাহাড়’ শব্দটা কানে এলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই রোমাঞ্চকর আঁকাবাঁকা পথ, মাটির সোঁদা গন্ধ, ঝর্নার কলকল শব্দ, বয়ে যাওয়া নদীর স্রোতের গর্জন আরও কত কী। চোখের সামনে প্রকৃতির সেই অদ্ভুত সৌন্দর্য যেন বারে বারে উঁকি দেয়। নীল আকাশ, নীল আকাশে সাদা তুলোর মতো মেঘের বিচরণ, আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে রোমাঞ্চকর যাত্রা। মনের সকল দুঃখ-কষ্ট-না পাওয়া ভুলে জীবনের মানেটাই যেন বদলে যায় এক মুহূর্তে। চোখ বন্ধ করে যেন সেই প্রকৃতিকে অনুভব করতে ইচ্ছা করে বারে বারে। তবে, এই প্রকৃতির সৌন্দর্য রূপ কখন যে বদলে রুদ্রমূর্তি ধারণ করবে তা কারও জানা নেই। আন্দাজ করাও প্রায় অসম্ভব। অন্তত সদ্য ঘটে যাওয়া নেপালের ঘটনা এরই প্রমাণ।

নেপাল, প্রকৃতির অফার সৌন্দর্যে ঘেরা নেপাল যেন হিমালয়ের এক রাজকন্যা। যেখানে আছে তুষার ঢাকা পর্বতমালা, সবুজ উপত্যকা ও নীল জলের হ্রদ। কিন্তু, ২৬ অগস্টের সকালেও কেউ জানতেন না জীবনের সব থেকে কঠিন দিন হতে চলেছে সেটি। সেদিনও হয়তো কোনও ভ্রমণার্থী নেপালের প্রাকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন, কেউ হয়তো সারা দিনের ট্যুর প্ল্যান করছিলেন, কেউবা ভিডিওকলে কাছের মানুষকে নেপালের সৌন্দর্য দেখাচ্ছিলেন। আবার সেখানের স্থানীয়রা নিত্যদিনের মতো যাবতীয় কাজ সেড়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু, কে জানত এক মুহূর্তে সব তছনছ হয়ে যাবে সব। পাহাড় থেকে নেমে আসা সেই ভয়ঙ্কর হড়পা বান মুহূর্তে ধ্বংস করে দেবে নেপালের সেই সৌন্দর্য। কেড়ে নেবে হাজার হাজার প্রাণ। পাহাড়ের কোলে গজিয়ে ওঠা সুন্দর গ্রামগুলোকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেবে।

বিগত এক দশক ধরে আমরা যত উন্নতির দিকে এগিয়ে চলেছি, তত যেন ধ্বংসলীলা শুরু হয়েছে পাহাড়ে। কখনও উত্তরাখণ্ড, কখনও উত্তবঙ্গে নেমে এসেছে দুর্যোগ। আর এবার রেহাই পেল না নেপাল। তবে এই প্রথম নয়। শেষ ১০ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যাবে, বারে বারে প্রকৃতির রোষে পড়েছে নেপাল। রইল সেই সকল তথ্য।

২০১৫ সালের ভূমিকম্প- ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই কম্পনের মাত্রা ছিল ৭.৮।শক্তিশালী ভূমিকম্পে নেপালে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল নেপালের লামজং জেলার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে।

২০২১ সালের বন্যা ও ভূমধস- অকাল ও অতিরিক্ত বর্ষণের ফলে বন্যা ও ভূমধস সৃষ্ট হয়। অমৌসুমী এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা ও পাহাড়ি ঘসে ১০০ জন নিহত হন। বন্যায় দেশের বিভিন্ন স্থান বহু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২০২৩ সালে বন্যা- অবিরাম বৃষ্টিপাতে সৃ্ষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়।

২০২৪ সালের ধ্বংসলীলা-

  • ভূমিধস- এই বছর জুন ও জুলাই চিত্রস্থানের সিমতলে ভূমিধসে বাস নদীতে ভেসে নিখোঁজ হয় ৫১ জন এবং সোলুখুম্বর থামে এলাকায় হিমবাহ হ্রদ ফেটে ভয়াবহ বন্যায় ঘরবাড়ি ও স্কুল ভেসে গিয়েছিল।
  • বন্যা ও ভূমিধস- ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে টানা বর্ষণের কারণে বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৬৬ জন মারা গিয়েছিলেন। সেই বছর কাটমান্ডু উপত্যকা-সহ নেপালের মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে গত কয়েক দশকের মধ্যে তীব্রতম বৃষ্টিপাত ও বন্যা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২৪৪ জনের মৃত্যু হয়। ১৭০ জনের বেশি আহত এবং ব্যাপক পরিকাঠামোগত ক্ষতি হয়।
  • প্রবল বর্ষণ- ২০২৪ সালে অক্টোবর মাসে প্রবল বর্ষণ ও বন্যায় ২৪৯ জন নিহত হন এবং ৪৬ বিলিয়ন রুপির বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়।

২০২৬ সালে হড়পা বান- ২০২৬ সালে চিন এবং নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্দে নদীর তীর থেকে বিশাল আকারের কাদা এবং ধ্বংসস্তূপ খসে পড়ার ফলে এই ভয়ঙ্কর হড়পা বানের সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র স্রোত ভোটকোশী এবং ত্রিশূলী নদীর গতিপথের গ্রাম এবং শহরগুলোর ওপর আছড়ে পড়েছে। বহু বাড়ি, রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে গিয়েছে। সেই বানে নিহতের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। তাদের মধ্যে আছেন ভারতীয়, আছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ড, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকার নাগরিকও।