হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকার সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'একতরফা চুক্তির দিন শেষ' এবং আমেরিকাকে এর ফল ভুগতে হবে। আবারও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
রবিবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ আমেরিকার হামলার কড়া জবাব দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া 'একতরফা' সমঝোতা স্মারক (MoU) এখন 'শেষ'। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (আগের টুইটার) গালিবাফ ওই MoU-এর পাঁচ নম্বর পয়েন্টটি তুলে ধরেন। সেখানে বলা ছিল, "এই MoU সই হওয়ার পর, ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরান শুধুমাত্র ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলির বিনামূল্যে নিরাপদ যাতায়াতের জন্য তার সেরা প্রচেষ্টা ব্যবহার করে ব্যবস্থা করবে..."

ইরানের দাবি
গালিবাফের দাবি, আমেরিকা এই চুক্তি থেকে সরে এসেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, "একতরফা চুক্তির দিন শেষ। আমরা বলেছিলাম: কথা রাখো, নয়তো দাম চোকাও। বাস্তবটা এবার সামনে।"
গালিবাফের এই হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে, যখন আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) শনিবার ইরানে এই সপ্তাহে তৃতীয় দফার হামলা চালিয়েছে। CENTCOM এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য তারা ইরানের বাহিনীকে দায়ী করছে। আমেরিকার বাহিনী স্থল ও সমুদ্র থেকে যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং নৌ-জাহাজের মাধ্যমে ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়।
হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ইরানের মিসাইল ও ড্রোন সাইট, নৌ-ঘাঁটি, অস্ত্রের গুদাম, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র। CENTCOM জানিয়েছে, এই সপ্তাহে তিন রাতের হামলায় মোট ৩০০টিরও বেশি টার্গেটে আঘাত হানা হয়েছে। তাদের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল এখনও স্বাভাবিক রয়েছে। এর জবাবে ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) জানিয়েছে, তারা জর্ডানে একটি সামরিক কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার এবং ড্রোন হ্যাঙ্গার ধ্বংস করেছে, জানিয়েছে আল জাজিরা।
কাতারের নিন্দা
অন্যদিকে, কাতার এই হামলার তীব্র নিন্দা করেছে এবং ইরানের সামরিক অভিযান 'অবিলম্বে ও সম্পূর্ণভাবে' বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে কাতারের বিদেশ মন্ত্রক তেহরানকে দায়ী করে বলেছে, এর জবাব দেওয়ার 'সম্পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে'।
কাতারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "কাতার রাষ্ট্র তার নিজের ভূখণ্ডে এবং জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাহরাইন, ওমান ও কুয়েতের উপর ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা করছে। এই হামলা দেশগুলির সার্বভৌমত্বের উপর নির্লজ্জ আঘাত এবং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ ও সুপ্রতিবেশীসুলভ নীতির চূড়ান্ত লঙ্ঘন।"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "কাতার রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের ৫১ নম্বর ধারা অনুযায়ী জবাব দেওয়ার এবং নিজের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, ভূখণ্ড ও নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে।"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই ধরনের কার্যকলাপ "উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে" এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছনোর উপর জোর দেওয়া হয়।
জর্ডনের নিশানায় ইরান
একইভাবে, জর্ডানও তার প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলির উপর ইরানের হামলাকে 'সার্বভৌমত্বের উপর নির্লজ্জ লঙ্ঘন, তাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি এবং একটি বিপজ্জনক উস্কানি' বলে বর্ণনা করেছে।
জর্ডানের বিদেশ মন্ত্রক এক্স-এ একটি পোস্টে জানিয়েছে, "জর্ডান বন্ধু রাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, বাহরাইন, ওমান, কাতার এবং কুয়েতের উপর ইরানের নৃশংস হামলার নিন্দা করছে... জর্ডান এই বন্ধু দেশগুলির পাশে রয়েছে এবং তাদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য নেওয়া সমস্ত পদক্ষেপকে সমর্থন করে।"
উল্লেখ্য, আমেরিকার এই হামলা এমন সময় হয়েছে, যার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের IRGC 'পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত' হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা করে। প্রেস টিভি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, IRGC জানিয়েছিল, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে আমেরিকা তাদের 'হস্তক্ষেপ' বন্ধ না করা পর্যন্ত এই কৌশলগত জলপথ বন্ধ থাকবে।


