ছয় দিন ধরে চলা দীর্ঘ শোকযাত্রার পর অবশেষে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন হল। জন্মস্থান মাশহাদে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। মার্কিন হামলা সত্ত্বেও লাখ লাখ মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় জমান।
তেহরান: মার্কিন-ইজরায়েল হামলায় নিহত প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে অবশেষে বিদায় জানাল ইরান। ছয় দিন ধরে চলা দীর্ঘ অনুষ্ঠানের পর তাঁর জন্মস্থান মাশহাদ শহরে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। শিয়া মুসলিমদের পবিত্র শহর, ইরাকের কারবালা ও নাজাফ সহ বিভিন্ন জায়গা ঘুরে খামেনেই এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের মরদেহ মাশহাদে আনা হয়। একদিকে যখন তেহরান, চাবাহার-সহ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহরগুলিতে আমেরিকার হামলা চলছে, তখনও প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় নেমেছিলেন লাখ লাখ মানুষ।

নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় আট ঘণ্টা দেরিতে আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্য শুরু হয়। মাশহাদে ইমাম রেজার সমাধিক্ষেত্রের পাশেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। তবে, এই দেরির সঙ্গে মার্কিন হামলার কোনও যোগ নেই বলে জানিয়েছে ইরানিয়ান কর্তৃপক্ষ। তাঁদের দাবি, ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া শোকযাত্রা ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন পবিত্র শহর ঘুরে বৃহস্পতিবার মাশহাদে পৌঁছয়। এই সময়ের মধ্যেই তেহরান ও মাশহাদকে সংযোগকারী রেলপথে হামলা চালায় আমেরিকা। তবে ইরানিয়ান আধিকারিকদের মতে, এই হামলার কারণে শেষকৃত্য দেরিতে শুরু হয়নি।
খামেনেইর শেষযাত্রা শুরু হয় তেহরান থেকে। এরপর ধর্মীয় নগরী কোম হয়ে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মাশহাদে। পথে পথে হাজার হাজার মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানান। শোকমিছিলে ইরানের জাতীয় পতাকা, ধর্মীয় পতাকা এবং খামেনেইর প্রতিকৃতি হাতে বহু মানুষকে দেখা যায়। শেষযাত্রা চলাকালীন নিরাপত্তাও ছিল নজিরবিহীন।
মাশহাদের ইমাম রেজা মাজার শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান। সেখানেই খামেনেইকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেষকৃত্যকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং বহু বিদেশি প্রতিনিধি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
এদিকে খামেনেইর মৃত্যুর পর ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইর দিকে। যদিও তিনি এখনও প্রকাশ্যে আসেননি। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দেশের অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
আলি খামেনেই ১৯৮৯ সাল থেকে প্রায় চার দশক ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আমলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে মানবাধিকার, বিরোধী আন্দোলন দমন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনাও ছিল।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনেই নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সেই ঘটনার কয়েক মাস পর এই দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় শেষযাত্রার মাধ্যমে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হল। এর মধ্য দিয়ে ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।


