হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে কি বিশ্বজুড়ে নতুন করে এনার্জি সংকট তৈরি হবে? এর ফলে কি ২০% তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে? আমেরিকা-ইরান সংঘাত কি এমন এক বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছেছে, যা তেল, গ্যাস এবং বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইনকেই স্তব্ধ করে দেবে? অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় কি বিশ্বজুড়ে পেট্রোলের দাম এবং বিদ্যুতের বিল বাড়ার নতুন খেলা শুরু হবে?
Iran Strait of Hormuz Crisis: মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা খবরে তোলপাড় গোটা বিশ্ব। ইরানের সেনা ঘাঁটিতে আমেরিকার ताबড়तोड़ বোমাবর্ষণের পর, তেহরান এবার বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় হাত দিয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) সরকারিভাবে ঘোষণা করেছে যে তারা হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে। এই প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল এনার্জি করিডোর। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে এই সরাসরি সংঘাত এখন এমন এক গ্লোবাল এনার্জি শকের (Global Energy Shock) ঝুঁকি তৈরি করেছে, যার আঁচ সরাসরি আপনার বাজেট, দেশের জিডিপি এবং পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত পৌঁছাতে চলেছে। গোটা বিশ্ব এখন বারুদের স্তূপের উপর বসে আছে, আর প্রশ্ন উঠছে যে বিশ্ব অর্থনীতি এই বড় ধাক্কাটা কতদিন সামলাতে পারবে?


ট্রাম্পের হুমকি আর বারুদের গন্ধ মাখা রাত
এই সাম্প্রতিক এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক উত্তেজনার শুরু হয় যখন মার্কিন বিমানবাহিনী পরপর দ্বিতীয় দিন ইরানের কিশ আইল্যান্ড এবং বন্দর আব্বাসে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মতে, এই মার্কিন হামলার জবাবেই তারা হরমুজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিস থেকে সাংবাদিকদের সামনে হুঙ্কার দিয়ে বলেন: "আমরা আজ আবার ওদের ওপর জোরদার হামলা চালাব। আমরা একটা পরমাণু চুক্তির খুব কাছাকাছি ছিলাম, কিন্তু ওরা আমাদের ক্রমাগত বিরক্ত করে চলেছে।"
মার্কিন সিনিয়র কর্মকর্তাদের মতে, একটি আমেরিকান অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ক্র্যাশ এবং থমকে থাকা আলোচনার কারণে হোয়াইট হাউসে হতাশা বাড়ছিল। এরপরই ট্রাম্প ইরানকে কাবু করতে এই সামরিক পদক্ষেপে সবুজ সংকেত দেন।

"একটাও জাহাজ ছাড়া হবে না..." ইরানের ভয়ঙ্কর হুঁশিয়ারি!
ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির খবর অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ সামরিক কমান্ড কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেল ট্যাঙ্কারকে 'শত্রুপক্ষের টার্গেট' হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সরাসরি উড়িয়ে দেওয়া হবে। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এখন থেকে শুধুমাত্র তাদের 'বন্ধু দেশগুলোর' জাহাজকেই এই পথ দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। ইরানের মিডিয়া এমনকি দাবি করেছে যে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার চেষ্টাকারী দুটি জাহাজে ইতিমধ্যেই হামলা করা হয়েছে। যদিও, আমেরিকান সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে এক্স (X) প্ল্যাটফর্মে একটি ফ্যাক্ট-চেক পোস্ট করে জানিয়েছে যে বাণিজ্যিক জাহাজ এখনও সেখান দিয়ে যাতায়াত করছে। কিন্তু দুই দেশের এই পরস্পরবিরোধী দাবিতে বিশ্ব বাজারে এমন এক অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা দেখে ব্যবসায়ীরা রীতিমতো কাঁপছেন।

হরমুজ বন্ধ, আতঙ্কে গোটা বিশ্ব! তেল সংকটে কি অর্থনীতি স্তব্ধ হবে?
হরমুজ প্রণালী শুধু একটি শিপিং লেন নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির হৃদস্পন্দন। ইরান এবং ওমানের মধ্যে অবস্থিত এই অত্যন্ত সরু সামুদ্রিক পথটি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সাথে যুক্ত করে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কাতারের মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এই পথেই তাদের তেল ও গ্যাস সারা বিশ্বে পাঠায়। যদি এই পথ কয়েক সপ্তাহ বা মাসের জন্য বন্ধ থাকে, তাহলে বিশ্ব এই ৭টি ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়বে:
- তেল সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ বন্ধ: প্রতিদিন ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) ব্যারেলের বেশি তেল এখান দিয়ে যায়। পথ বন্ধ হলেই সঙ্গে সঙ্গে তেলের আকাল দেখা দেবে।
- অপরিশোধিত তেলের দাম $95 ছাড়িয়েছে: খবর আসতেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২.৪৭% বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৯৫.৪০ ডলারে এবং আমেরিকান ক্রুডের দাম ৯২.৬৩ ডলারে পৌঁছেছে।
- অন্ধকারে ডুবতে পারে অনেক দেশ: বিশ্বের ২০% লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (LNG) এখান থেকেই সরবরাহ হয়। কাতার থেকে এই সরবরাহ বন্ধ হলে এশিয়া ও ইউরোপে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেবে।
- মূল্যবৃদ্ধির নতুন বিশ্বরেকর্ড: তেলের দাম বাড়লে পরিবহন এবং উৎপাদন খরচ আকাশছোঁয়া হবে, যার ফলে প্রতিটি জরুরি জিনিসপত্রের দাম বাড়বে।
- খাবারের থালায় টান: দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকায় ইউরিয়া ও সারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে চাষবাসে প্রভাব পড়বে এবং খাদ্য সুরক্ষায় সরাসরি সংকট তৈরি হবে।
- বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক মন্দা: রাষ্ট্রপুঞ্জের (UNCTAD) মতে, ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত বিশ্ব বিকাশের হারের অনুমান পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
- কোটি কোটি চাকরি বিপদে: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) অনুসারে, এই বড় এনার্জি সংকটের ফলে সংস্থাগুলোর খরচ বাড়বে, যার জেরে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ব্যাপক ছাঁটাই এবং দারিদ্র্য বাড়বে।
ওয়াশিংটন এবং তেহরানের এই শক্তি প্রদর্শনের মাঝে এখন গোটা বিশ্বই যেন পণবন্দী। সুপারমার্কেটের তাক, আপনার বিদ্যুতের বিল এবং শেয়ার বাজারের ভাগ্য এখন নির্ভর করছে এই সামুদ্রিক অচলাবস্থা আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর।


