চীন ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্কটা এমনিতেই জটিল। তার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে দুই দেশের বিজ্ঞানীদের রহস্যজনক মৃত্যু। গত ২ বছরে চিনে অস্ত্র ও ড্রোন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ৮ জন এবং আমেরিকায় পারমাণবিক প্রকল্পের ১০ জন বিজ্ঞানীর সন্দেহজনক মৃত্যু হয়েছে। যা দেখে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ব কি এক নতুন 'সায়েন্টিফিক কোল্ড ওয়ার'-এর দিকে এগোচ্ছে?

Scientific Cold War China US: বিশ্বের দুই মহাশক্তি, চীন আর আমেরিকা। বাণিজ্য, প্রযুক্তি বা সামরিক শক্তি—সবকিছু নিয়েই তাদের রেষারেষি। তবে এখন এই দুই দেশকে নিয়ে চর্চা হচ্ছে এক নতুন ও ভয়ঙ্কর কারণে। আর তা হলো বিজ্ঞানীদের রহস্যজনক মৃত্যু। গত কয়েক বছরে দুই দেশেই প্রতিরক্ষা, ড্রোন, পারমাণবিক এবং হাইপারসনিক প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাগুলোই বিশ্বজুড়ে জটিল প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চিনে অস্ত্র, ড্রোন এবং মিসাইল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ৮ জন বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, আমেরিকাতেও গত তিন বছরে পারমাণবিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ১০ জন বিজ্ঞানীর রহস্যমৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। এই ঘটনাগুলোই নতুন এক 'সায়েন্টিফিক কোল্ড ওয়ার' বা 'বৈজ্ঞানিক স্নায়ুযুদ্ধ'-এর আশঙ্কা তৈরি করেছে।

চিনে ২ বছরে ৮ বিজ্ঞানীর সন্দেহজনক মৃত্যু

আন্তর্জাতিক রিপোর্ট বলছে, চিনে যে বিজ্ঞানীদের মৃত্যু হয়েছে, তাঁরা দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে ড্রোন প্রযুক্তি, হাইপারসনিক মিসাইল, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এবং অত্যাধুনিক রসায়নের মতো বিষয় রয়েছে। কয়েকজন বিজ্ঞানীর মৃত্যু পথ দুর্ঘটনায় হয়েছে, আবার কয়েকজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে হঠাৎ অসুস্থতা বা অজানা কারণ দেখানো হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর আসল কারণ এখনও স্পষ্ট নয়।

কোন বিজ্ঞানীদের মৃত্যুতে তোলপাড়?

  1. ঝাং জিয়াওক্সিন (Zhang Xiaoxin): মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ঝাং ২০২৪ সালে একটি পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। তাঁর মৃত্যু নিয়ে সরকারিভাবে এখনও স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।
  2. ফাং ডেইনিং (Fang Daining): হাইপারসনিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ফাং ডেইনিং ২০২৪ সালে আফ্রিকা সফরের সময় মারা যান। তিনি তাইওয়ান ইস্যুতে বেশ আগ্রাসী মনোভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন।
  3. লি মিনইয়ং (Li Minyong): ২০২৫ সালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে লি মিনইয়ং-এর আকস্মিক মৃত্যু অনেক প্রশ্ন তুলেছে। তিনি বায়োমেডিক্যাল কেমিস্ট্রি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
  4. লিউ ডংহাও (Liu Donghao): ড্রোন প্রযুক্তি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত লিউ ২০২৪ সালে একটি দুর্ঘটনায় মারা যান। তাঁর বয়স ছিল ৫১ বছর।
  5. ঝাং ডাইবিং (Zhang Daibing): ড্রোন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত ঝাং-এর ২০২৩ সালে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়।
  6. ইয়ান হং (Yan Hong): হাইপারসনিক মিসাইল তৈরির কাজে যুক্ত ইয়ান হং ২০২৪ সালে এক অজানা রোগে মারা যান।
  7. ঝৌ গুয়াংইউয়ান (Zhou Guangyuan): অত্যাধুনিক রসায়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ঝৌ ২০২৩ সালে অজানা অসুস্থতার কারণে মারা যান।

এই ধারাবাহিক মৃত্যু চীনের প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানী মহলে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।

আমেরিকাতেও ১০ বিজ্ঞানীর রহস্যমৃত্যু

কিছুদিন আগে আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল যে, গত তিন বছরে সে দেশে ১০ জন বিজ্ঞানীর সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়েছে। এঁরা সবাই পারমাণবিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। রিপোর্ট সামনে আসার পর হোয়াইট হাউস বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করার কথা জানায়। যদিও সেই তদন্তের কোনও বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আনা হয়নি।

এটা কি নতুন 'সায়েন্টিফিক কোল্ড ওয়ার'?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আজকের যুগে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই বিশ্বশক্তির সবচেয়ে বড় ভিত্তি। হাইপারসনিক মিসাইল, ড্রোন, পারমাণবিক ক্ষমতা এবং মহাকাশ প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে যে দেশ এগিয়ে থাকবে, কৌশলগতভাবে তারাই শক্তিশালী হবে। এমন পরিস্থিতিতে, এই ক্ষেত্রগুলির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক রহস্যমৃত্যুকে সাধারণ ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে না। অনেক বিশ্লেষক একে এক নতুন ধরনের ঠান্ডা যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে লড়াই সীমান্তে নয়, ল্যাবরেটরি এবং গবেষণা কেন্দ্রের ভিতরে চলছে।

দুই দেশের নীরবতায় বাড়ছে সন্দেহ

সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মৃত্যুগুলো নিয়ে না চীন खुलकर কোনও বিস্তারিত বিবৃতি দিয়েছে, আর না আমেরিকা স্পষ্টভাবে কোনও ষড়যন্ত্রের কথা স্বীকার করেছে। যখন এত গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীদের মৃত্যু হয় এবং তার কোনও ठोस কারণ সামনে আসে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ আরও গভীর হয়। এই কারণেই আন্তর্জাতিক স্তরে পুরো বিষয়টি নিয়ে गंभीर আলোচনা চলছে।

আপাতত এটা বলা কঠিন যে এই মৃত্যুগুলোর পিছনে কোনও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আছে কি না। তবে এটা নিশ্চিত যে দুই মহাশক্তিতে বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক রহস্যমৃত্যু কোনও সাধারণ ঘটনা হতে পারে না। এটা কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি বিশ্ব এক নতুন অদৃশ্য যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতেই মিলবে।