ইজরায়েলের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে নতুন মেজাজে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আরব দলগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন তিনি। এক্স হ্যান্ডেলে ভিডিও শেয়ার করে এ নিয়ে নিজের কড়া অবস্থান তুলে ধরেছেন নেতানিয়াহু।

ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুক্রবার বিরোধী আইনপ্রণেতা ও আরব রাজনৈতিক নেতাদের পুরোনো মন্তব্যের একটি ভিডিও সংকলন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি আরব দলগুলোর সাথে জোট বাঁধার বিরুদ্ধে নিজের কড়া অবস্থান আরও একবার স্পষ্ট করে দেন। নেতানিয়াহু সাফ জানান, "ওদের সাথে কোনোভাবেই সরকার গঠন করা বারণ।"

আরব দলগুলিকে নিয়ে কড়া বার্তা নেতানিয়াহুর

এক্স মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন নেতানিয়াহু। সেখানে আহমদ তিবি, ইমান খাতিব-ইয়াসিন, মনসুর আব্বাস, সামি আবু শেহাদেহ, অফার ক্যাসিফ, ইউসেফ জাবারিন এবং আয়মান ওদেহের মতো একাধিক আরব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্যের অংশ দেখা যাচ্ছে। ভিডিওতে দেখতে পাওয়া আরব নেতারা ফিলিস্তিনের দাবিতে সওয়াল করছিলেন। ডানপন্থী ইহুদি গোষ্ঠীগুলো বরাবরই এই দাবিকে দেশবিরোধী বলে মনে করে।

কঠিন সময় নেতানিয়াহুরও

নেতানিয়াহু সুর চড়ালেও তার জন্য সরকার গড়ার পথ কিন্তু মোটেও সহজ হচ্ছে না। ইজরায়েলের 'এন১২' নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হারেদি (অরথোডক্স ইহুদি) সংবাদপত্র 'হামোডিয়া' এবং 'হামাশবিজ' স্পষ্ট জানিয়েছে যে হারেদি দলগুলো নিজেদের আলাদাভাবে বিবেচনা করতে চায়, নেতানিয়াহু জোটের অংশ হিসেবে নয়। তাছাড়া, 'টোরাহ জুডাইজম' দলের এক সূত্র নিশ্চিত করেছে, তারা কোনো রাজনৈতিক জোটেই নেই। বুথফেরত সমীক্ষা বা আসন সংখ্যা অনুযায়ী ইউটিজে ইজরায়েলি সংসদে (নেসেট) ৭টি আসন এবং শাস ৬টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, বর্তমান অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের নেতৃত্বাধীন 'রিলিজিয়াস জিয়নইজম' এবং মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের 'ওৎজমা ইহুদিত' নেতানিয়াহুর পাশ থেকে হটবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে, বিরোধী দলনেতা এবং 'বি ইয়াহাদ'-এর ২ নম্বর নেতা ইয়ার লাপিদ নির্বাচনের ফলাফল দেখে নেতানিয়াহু-বিরোধী শিবিরের জয় ঘোষণা করেছেন। তার দাবি, নেতানিয়াহুর কাছে সরকার গড়ায় মতো পর্যাপ্ত সংখ্যা নেই। একই সঙ্গে তিনি দলীয় সমর্থকদের জোটের আলোচনা শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন।

সরকার গঠনে পাল্টা পদক্ষেপ বিরোধী

শুক্রবার এক্স হ্যান্ডেলে একটি লম্বা বার্তায় লাপিদ স্বীকার করেন, ফলাফল তাদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়নি ঠিকই, তবে ভোটারদের উপস্থিতি এবং নেতানিয়াহু জোটের ধরাশায়ী অবস্থা এটা প্রমাণ করে যে জয় তাদেরই হয়েছে। ভোটাভুটির হার ৭৭.৭ শতাংশ ছুঁয়েছে উল্লেখ করে লাপিদ বলেন, "জনগণ বেরিয়ে এসে ভোট দিয়েছে। ১৯৯৯ সালের পর এটাই সর্বোচ্চ ভোট।" তিনি আরও বলেন, "নেতানিয়াহুর দল পেয়েছে মাত্র ৫৩টি আসন। এক কথায় ধস নেমেছে। এর মধ্যে আবার ১৩টি আসন এমন দলগুলোর, যারা নিজেদের জিয়নিস্ট মনে করে না। তাহলে ওর হাতে পড়ে থাকে মাত্র ৪০টি আসন। যেভাবেই হোক না কেন, এখান থেকে সরকার টানার কোনো ক্ষমতা নেতানিয়াহুর নেই।" বিরোধী শিবিরের জয়ের দাবি তুলে লাপিদ বলেন, "তাই জয় আমাদেরই হয়েছে। এটা হয়তো নকআউট জয় নয়, পয়েন্টের জয়। তবে জয় তো জয়ই।"

সরকার গঠন করা যে কঠিন কাজ, তা মেনে নিয়েই লাপিদ বলেন, যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন, তাদের প্রতি বিরোধী শিবিরের একটি দায়িত্ব রয়েছে। জোট গড়ার সবরকম চেষ্টা তারা চালাবেন।

১০ নভেম্বর নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান

শুক্রবার ইজরায়েলের সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটি জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করল। ২৬তম নেসেটের আসন বন্টন নিশ্চিত হয়ে গেছে, যার শপথ আগামী ১০ নভেম্বর। নেতানিয়াহু সমর্থিত শিবির ৫৩টি আসন পেয়েছে, যা সরকার গড়ার জাদুকরী সংখ্যার থেকে বেশ কম। 'দ্য টাইমস অব ইজরায়েল'-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হয়েছে। তাদের পরেই ২১টি আসন পেয়েছে ইয়াশার। এছাড়া বি'ইয়াহাদ ১২টি, জয়েন্ট লিস্ট ১১টি, ডেমোক্র্যাটস ও রা'আম ৮টি করে আসন পেয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল বেইতেনু, ইউনাইটেড টোরাহ জুডাইজম এবং ওৎজমা ইহুদিত পেয়েছে ৭টি করে আসন। শাস এবং রিলিজিয়াস জিয়নইজম পেয়েছে ৬টি করে আসন। 'দ্য টাইমস অব ইজরায়েল'-এর হিসাব বলছে, নেতানিয়াহু সমর্থিত জোটের হাতে রয়েছে ৫৩টি আসন, বিরোধী জোটের হাতে ৪৮টি এবং আরব দলগুলোর হাতে রয়েছে ১৯টি আসন। চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, মোট ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ৭৭.৯ শতাংশ মানুষ, যেখানে মোট ভোট পড়েছে ৫৭,১৬,৬৬৫টি। অন্যদিকে 'দ্য রিজার্ভিস্টস' (২.৭% ভোট), 'পিপল অব ইসরায়েল' (১.৭% ভোট) এবং 'চারেদি পাবলিক' (০.২% ভোট) নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ৩.২৫ শতাংশ ভোটের সীমা পার করতে পারেনি, ফলে তারা কোনো আসন পায়নি।