ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান কি এবার আরও সহজ হবে? ইজরায়েলের বিজ্ঞানীরা এক নতুন পদ্ধতির কথা বলছেন। এতদিন শুধু অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো রাসায়নিকের উপস্থিতি খোঁজা হত। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, ওই রাসায়নিকগুলো কীভাবে সাজানো আছে আর তাদের মধ্যে কতটা বৈচিত্র্য আছে, সেটাই আসল সূত্র।
পৃথিবীর বাইরে প্রাণের চিহ্ন খুঁজতে বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এবার ইজরায়েলের ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী গিডিওন ইয়োফের নেতৃত্বে একটি নতুন গবেষণা এই অনুসন্ধানে বড়সড় বদল আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজতে মূলত অ্যামিনো অ্যাসিড বা ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো 'বায়োসিগনেচার' অণু পরীক্ষা করতেন। কিন্তু গবেষকরা জানাচ্ছেন, এই রাসায়নিক পদার্থগুলো অনেক সময় প্রাণ ছাড়াও রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হতে পারে। তাই শুধু এগুলোর উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে প্রাণের প্রমাণ খোঁজা খুব একটা নির্ভরযোগ্য নয়।

এই সমস্যার সমাধান করতেই নতুন গবেষণাটি একটি অন্য পথের সন্ধান দিচ্ছে। শুধু অণুর উপস্থিতি নয়, বরং সেগুলি কীভাবে সাজানো আছে এবং তাদের মধ্যে কতটা বৈচিত্র্য রয়েছে, তা খতিয়ে দেখার এক নতুন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। 'নেচার অ্যাস্ট্রোনমি' জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, এর জন্য গবেষকরা গ্রহাণু, উল্কাপিণ্ড, অণুজীব, মাটি এবং জীবাশ্ম সহ প্রায় ১০০টির মতো নমুনা পরীক্ষা করেছেন।
গিডিওন ইয়োফের নেতৃত্বে হওয়া এই গবেষণার মূল আবিষ্কার হলো, জীবন্ত প্রাণীর তৈরি অ্যামিনো অ্যাসিডের মধ্যে অনেক বেশি বৈচিত্র্য এবং একটি নির্দিষ্ট সজ্জা বা বিন্যাস থাকে। অন্যদিকে, প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্যাটি অ্যাসিডে বৈচিত্র্য কম এবং তাদের বিন্যাসও অগোছালো। গবেষকদের মতে, এই বিশেষ গঠনই প্রাণের উপস্থিতির একটি শক্তিশালী সংকেত হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সময়ের সাথে সাথে নষ্ট হয়ে যাওয়া নমুনাতেও এই বিশেষ প্যাটার্নগুলো টিকে থাকে। এমনকি ডাইনোসরের ডিমের জীবাশ্মেও এই জৈব-রাসায়নিক গঠনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর থেকে আশা করা হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহে, যেখানে একসময় প্রাণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ছিল বলে মনে করা হয়, সেখানে প্রাচীন অণুজীবের প্রমাণ খুঁজে পেতে এই পদ্ধতিটি সাহায্য করতে পারে।
এদিকে, নাসার 'ইউরোপা ক্লিপার' (Europa Clipper) মিশনের জন্যও এই নতুন প্রযুক্তি অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। নাসার এই মহাকাশযানটি বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপার দিকে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, ইউরোপার বরফের চাদরের নিচে পৃথিবীর সব মহাসাগরের থেকেও দ্বিগুণ বেশি জল রয়েছে। তাই প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনার নিরিখে ইউরোপাকে অন্যতম সেরা জায়গা বলে মনে করা হয়।
ইউরোপা ক্লিপার ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ইউরোপায় পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই যানে এমন সরঞ্জাম রয়েছে যা ওই উপগ্রহের পৃষ্ঠ থেকে বরফের কণা বিশ্লেষণ করতে পারে। গবেষকরা আশা করছেন, নতুন এই বায়োসিগনেচার পদ্ধতি ব্যবহার করে সেখানে পাওয়া অ্যামিনো অ্যাসিডের গঠন পরীক্ষা করে প্রাণের প্রমাণ আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।


