পাকিস্তান একদিকে ইরানের পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে আমেরিকার সামরিক অভিযানে গোপনে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ। আকাশসীমা ব্যবহার থেকে শুরু করে নৌবাহিনীর জন্য গোয়েন্দা তথ্য, ইসলামাবাদ কি এক বিপজ্জনক খেলায় মেতেছে?

নয়া দিল্লি: প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ সাজার চেষ্টা করলেও, পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের ভূমিকা পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতকে নতুন দিকে মোড় দিতে পারে। একদিকে পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী শান্তি ফেরাতে তেহরান আর রিয়াধে দৌড়ঝাঁপ করছেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানে মার্কিন হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে নিন্দা করছেন। কিন্তু শোনা যাচ্ছে, আসল গল্পটা নাকি একেবারেই অন্যরকম।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

গোপন সাহায্যের অভিযোগ

একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্টে দাবি করা হচ্ছে, পাকিস্তান নাকি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে গোপনে সাহায্য করে চলেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরতে থাকা এই খবর যদি সত্যি হয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় কৌশলগত প্রতারণার ঘটনা হবে।

অভিযোগগুলোও বেশ নির্দিষ্ট। বলা হচ্ছে, মার্কিন গোয়েন্দা বিমান, বিশেষ করে MQ-9B ড্রোনের মতো সশস্ত্র নজরদারি বিমানকে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে।

এমনকী, আরব সাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর অভিযানে সহযোগিতার জন্য নাকি পাকিস্তানের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানও উড়ছে। সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ হলো, পাকিস্তানের নৌবাহিনী নাকি ইরানের জাহাজ, এমনকি পাকিস্তানের জলসীমার বাইরে থাকা ছোট ছোট নৌকার অবস্থানও মার্কিন বাহিনীকে জানিয়ে দিচ্ছে, যাতে তাদের নিশানা করা সহজ হয়।

মজার বিষয় হলো, পাকিস্তান কিন্তু প্রকাশ্যে বারবার বলে আসছে যে তারা এই সংঘাতে জড়াতে চায় না এবং আলোচনার মাধ্যমেই একমাত্র শান্তি ফিরতে পারে। মার্কিন ড্রোন পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করছে, এই দাবিকে তো পাক প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সরাসরি "পুরোপুরি ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর" বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

পুরোনো কৌশল

কিন্তু যারা পাকিস্তানের ইতিহাস নিয়ে চর্চা করেন, তারা জানেন যে সবকিছু অস্বীকার করাটা তাদের পুরোনো অভ্যাস। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় পাকিস্তান বছরের পর বছর ধরে অস্বীকার করেছিল যে তারা মুজাহিদীনদের কাছে অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য সিআইএ-র প্রধান মাধ্যম ছিল। তাই প্রকাশ্যে এক কথা বলা আর গোপনে অন্য কাজ করা, এটা পাকিস্তানের জন্য নতুন কিছু নয়।

প্রযুক্তিগত প্রমাণ: এফ-১৬ আপগ্রেড

প্রযুক্তিগত কিছু প্রমাণও এই সন্দেহকে আরও জোরালো করছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ, ওয়াশিংটন ৬৮৬ মিলিয়ন ডলারের একটি সামরিক চুক্তিতে সই করে, যার মাধ্যমে পাকিস্তানের এফ-১৬ বিমান বহরকে আপগ্রেড করা হবে। এই প্যাকেজের মূল আকর্ষণ হলো Link-16 ট্যাকটিক্যাল ডেটা লিঙ্ক এবং Mode 5 IFF ক্রিপ্টোগ্রাফিক সিস্টেম।

এই প্রযুক্তিগুলো আসলে ন্যাটো জোটের যুদ্ধের সরঞ্জাম। এর মাধ্যমে পাকিস্তানি বিমানগুলো মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে একই আকাশসীমায় নিরাপদে এবং একসঙ্গে কাজ করতে পারে। ফেব্রুয়ারী ২০২৬-এ পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক মাস আগে এই চুক্তি ঘিরে এমন অনেক প্রশ্ন উঠছে, যার উত্তর ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে দেয়নি।

ইসলামাবাদের লাভ কোথায়?

পাকিস্তানের এই চালের পেছনে একটা বড় কৌশলগত কারণ আছে। উপসাগরীয় দেশগুলো, তুরস্ক এমনকি ব্রিটেনও যখন আমেরিকাকে তাদের দেশে ঘাঁটি গাড়তে দেয়নি, তখন মার্কিন অভিযানের জন্য পাকিস্তানের পশ্চিম আকাশসীমা এবং আরব সাগর উপকূলের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ইসলামাবাদের জন্য এই গোপন সহযোগিতার বদলে মিলছে অস্ত্রের প্যাকেজ, কূটনৈতিক প্রভাব এবং আমেরিকার কাছে দক্ষিণ এশিয়ায় তার পুরোনো 'অপরিহার্য সঙ্গী'র তকমা ফিরে পাওয়া। মে ২০২৫-এর ভারত-পাকিস্তান সংঘাত এবং ভারত-মার্কিন সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর পাকিস্তানের এই তকমা কিছুটা ফিকে হয়ে গিয়েছিল।

ইরানের সঙ্গে ঝুঁকি

তবে এই খেলার ঝুঁকিও কম নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ইরান যে সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালাতে পারে, তার প্রমাণ জানুয়ারী ২০২৪-এ বেলুচিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তারা দিয়েছে।

যদি ইরান মনে করে যে, যে প্রতিবেশী দেশ প্রকাশ্যে বন্ধুত্বের কথা বলছে, সে-ই পেছন থেকে ছুরি মারছে, তাহলে বদলা নেওয়ার জন্য তাদের কাছে অনেক রাস্তা খোলা থাকবে। আপাতত ইসলামাবাদ কূটনীতিকের মুখোশ পরে রয়েছে। কিন্তু সেই মুখোশ এবার হয়তো খসে পড়তে শুরু করেছে।