সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিন বছর কারাভোগের পর ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে পাকিস্তানের রাজনীতিতে। আদালতের এই নির্দেশকে ঘিরে শাহবাজ শরিফ নেতৃত্বাধীন সরকারের অস্বস্তির কারণও ব্যাখ্যা করেছেন পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মীর।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তিন বছর কারাভোগের পর ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে পাকিস্তানের রাজনীতিতে। আদালতের এই নির্দেশকে ঘিরে শাহবাজ শরিফ নেতৃত্বাধীন সরকারের অস্বস্তির কারণও ব্যাখ্যা করেছেন পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মীর। ‘ইন্ডিয়া টুডে’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে আদালতের দেওয়া সাময়িক স্বস্তি অনেক সময়ই কোনও রাজনীতিকের প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে দিয়েছে। হামিদ মীরের মতে, শাহবাজ শরিফ চাইলে নিজের ভাই নওয়াজ শরিফের ঘটনাকেই উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারেন। ২০১৮ সালে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন একাধিক দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে গ্রেফতার হন নওয়াজ। পরের বছর চিকিৎসার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান তিনি। পরে লাহোর হাইকোর্ট তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিলে নওয়াজ লন্ডনে চলে যান।

২০২৩ সাল পর্যন্ত লন্ডনে থাকার পর ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত ও কারারুদ্ধ হওয়ার পরই দেশে ফেরেন নওয়াজ। ফলে ইমরানকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশকে মীর দেখছেন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই আরেকটি পুনরাবৃত্তি হিসেবে। তাঁর কথায়, পাকিস্তানের রাজনীতিতে এটি নতুন কোনও ঘটনা নয়—ইতিহাস যেন ফের একই পথে হাঁটছে।

গোপন সমঝোতার জল্পনা কেন?

চলতি সপ্তাহে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতির কথা বিবেচনা করে ইমরান খানকে আদিয়ালা জেল থেকে চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে একাধিক দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেলে রয়েছেন পিটিআই প্রধান। আদালতের নির্দেশ অবশ্য মেনে নেয়নি শাহবাজ সরকার। বরং দ্রুত সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। হামিদ মীরের দাবি, পাকিস্তানে আদালতের এমন সিদ্ধান্তকে অনেক সময়ই পর্দার আড়ালের সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। তাঁর মতে, নওয়াজ শরিফের ক্ষেত্রে অতীতে যে ধরনের আইনি স্বস্তি এসেছিল, তার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাই হয়তো শরিফ পরিবারকে উদ্বিগ্ন করছে।

সম্প্রতি পিএমএল-এন-এর সিনেটর নাসির ভাটও দাবি করেছেন, শরিফ পরিবারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে এবং ইমরান খানকে শীঘ্রই তাঁর বাড়িতে স্থানান্তর করা হতে পারে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব দীর্ঘদিনের। ফলে ইমরান খানের জন্য আদালতের এই স্বস্তির নেপথ্যে সেনাবাহিনীর কোনও সম্মতি রয়েছে কি না, তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করেননি হামিদ মীর। বরং খানিকটা ব্যঙ্গের সুরে তিনি মনে করিয়ে দেন, সেনাবাহিনী বরাবরই বলে এসেছে যে তারা পাকিস্তানের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। মীরের এই মন্তব্যের মধ্যেই যেন পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি তাঁর ইঙ্গিত স্পষ্ট।

শরিফ পরিবার কেন আরও চাপে?

ইমরান খানকে ঘিরে আইনি পরিস্থিতির পাশাপাশি ক্ষমতাসীন জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনও শাহবাজ শরিফ সরকারের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পিএমএল-এনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র পিপিপি নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো সম্প্রতি শরিফ পরিবারকে সতর্ক করে বলেছেন, তাদের ক্ষমতার দিনগণনা শুরু হয়ে গিয়েছে। পিওকে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ থেকে শুরু করে ওই অঞ্চলের অস্থিরতা—একাধিক ইস্যুতে শরিফ সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন তিনি।

নতুন প্রদেশ গঠন নিয়েও পিএমএল-এন ও পিপিপির মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। হামিদ মীরের মতে, বিলাওয়াল ভুট্টো ইদানিং সরকারের উপর যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। এর পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির ‘সিস্টেম ভেঙে পড়েছে’ মন্তব্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নাকভিকে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য দাবিদার হিসেবেও অনেকে দেখেন।

‘ককরোচ মুভমেন্ট’-এর আশঙ্কা

শরিফ সরকারের সামনে আরও একটি বড় আশঙ্কার কথা বলেছেন হামিদ মীর। সেটা হল ‘ককরোচ মুভমেন্ট’। তাঁর মতে, পাকিস্তানের তরুণদের একটা অংশ বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। পার্লামেন্ট কিংবা বিচার বিভাগের উপরও তাঁদের বিশ্বাস কমছে। এই অসন্তোষ যদি রাস্তায় নেমে আসে, তা হলে তা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যেই খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছেন। মীরের মতে, এই কর্মসূচি পিটিআই কর্মীদের ফের সক্রিয় করে তুলতে পারে এবং শাহবাজ সরকারের উপর চাপ বাড়াতে পারে।

ইমরান কি ফিরতে পারবেন রাজনীতিতে?

ইমরান খানের শারীরিক অবস্থাও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। রক্তচাপের ওঠানামা, হৃদস্পন্দনের সমস্যা এবং মানসিক চাপের পাশাপাশি তাঁর চোখের সমস্যা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে হামিদ মীর জানিয়েছেন। তবে ইমরানের জনপ্রিয়তা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই মনে করেন তিনি। আর আদালতের নির্দেশে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ ভবিষ্যতে তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মীর মনে করিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কার্যত কিছুই নেই। নওয়াজ শরিফ যদি কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে আইনি স্বস্তি পান এবং ফের রাজনীতির ময়দানে ফিরতে পারেন, তা হলে ইমরান খানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রত্যাবর্তন অসম্ভব নয়। ক্রিকেটের মাঠে একাধিকবার অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন ইমরান খান। এবার রাজনীতির ময়দানেও কি তিনি ফের সেই প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখতে পারবেন? পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।