বুধবার তাইওয়ানের জলসীমার কাছে ৫টি চিনা বিমান ও ৬টি যুদ্ধজাহাজ দেখা গেছে। এর মধ্যে ৪টি বিমান তাদের এয়ার ডিফেন্স আইডেন্টিফিকেশন জোনে ঢুকে পড়ে। ঠিক আগের দিনও ৯টি চিনা বিমান ও ৬টি জাহাজ শনাক্ত করেছিল তাইওয়ান।

বুধবার সকালেও তাইওয়ানের আশেপাশে চিনা সেনার আনাগোনা থামেনি। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৬টা পর্যন্ত তারা ৫টি চিনা সামরিক বিমান, ৬টি নৌবাহিনীর জাহাজ এবং ৩টি অন্যান্য জাহাজকে তাদের জলসীমার কাছে ঘুরতে দেখেছে। এই ৫টি বিমানের মধ্যে ৪টি তাইওয়ানের দক্ষিণ-পশ্চিম এয়ার ডিফেন্স আইডেন্টিফিকেশন জোনে (ADIZ) ঢুকে পড়েছিল।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ একটি পোস্টে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানায়, "আজ সকাল ৬টা (UTC+8) পর্যন্ত তাইওয়ানের চারপাশে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (PLA) ৫টি বিমান, ৬টি নৌবাহিনীর জাহাজ (PLAN vessels) এবং ৩টি সরকারি জাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে। ৫টির মধ্যে ৪টি বিমান তাইওয়ানের দক্ষিণ-পশ্চিম ADIZ-এ প্রবেশ করে। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।"

এর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ মঙ্গলবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ৯টি চিনা সামরিক বিমান, ৬টি নৌবাহিনীর জাহাজ এবং ৩টি সরকারি জাহাজ শনাক্ত করে।

সেদিনও X-এ দেওয়া পোস্টে মন্ত্রক জানিয়েছিল, "আজ সকাল ৬টা (UTC+8) পর্যন্ত তাইওয়ানের চারপাশে ৯টি চিনা বিমান, ৬টি নৌবাহিনীর জাহাজ এবং ৩টি সরকারি জাহাজ দেখা গেছে। ৯টির মধ্যে ৮টি বিমান তাইওয়ানের উত্তর, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং পূর্ব ADIZ-এ প্রবেশ করেছিল। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী পরিস্থিতির উপর নজর রেখেছে এবং জবাব দিয়েছে।"

এই সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

তাইওয়ানকে নিয়ে চিনের এই দাবির পিছনে রয়েছে এক জটিল ইতিহাস এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বেজিং বরাবরই তাইওয়ানকে তাদের দেশের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে। এই নীতি তাদের দেশের আইন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তারা তুলে ধরে। অন্যদিকে, তাইওয়ানের নিজস্ব সরকার, সেনাবাহিনী এবং অর্থনীতি রয়েছে এবং তারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবেই দেখে। ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়ার মতে, তাইওয়ানের এই স্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের সার্বভৌমত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং হস্তক্ষেপ না করার নীতিগুলির জন্য একটি বড় পরীক্ষা।

কিং বংশ থেকে জাপানি শাসন

চিনের দাবির শুরুটা হয় ১৬৮৩ সাল থেকে, যখন কিং বংশ মিং অনুগত কক্সিঙ্গাকে হারিয়ে তাইওয়ান দখল করে। কিন্তু তখন তাইওয়ান কিং সাম্রাজ্যের একটি প্রান্তিক অঞ্চল ছিল। আসল পরিবর্তন আসে ১৮৯৫ সালে। প্রথম চিন-জাপান যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর কিং বংশ তাইওয়ানকে জাপানের হাতে তুলে দেয়। এরপর প্রায় ৫০ বছর তাইওয়ান জাপানের উপনিবেশ ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী এবং চিনের গৃহযুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হারের পর তাইওয়ান আবার চিনের নিয়ন্ত্রণে আসে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। এরপর ১৯৪৯ সালে চিনে গৃহযুদ্ধ শেষ হলে মূল ভূখণ্ডে তৈরি হয় পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না (PRC)। অন্যদিকে, রিপাবলিক অফ চায়না (ROC) সরকার তাইওয়ানে পালিয়ে গিয়ে সেখান থেকেই সমগ্র চিনের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করতে থাকে। এর ফলে দুই পক্ষই সার্বভৌমত্বের দাবিদার হয়ে ওঠে। PRC মূল ভূখণ্ডের উপর এবং ROC তাইওয়ানের উপর। সেই থেকে তাইওয়ান কার্যত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই কাজ চালাচ্ছে, কিন্তু চিনের সঙ্গে সামরিক সংঘাত এড়াতে তারা কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেনি।