আপনি যদি এখনকার ক্যালেন্ডারে ১৫৮২ সালের অক্টোবর মাসটা খোলেন, একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পাবেন। ৪ অক্টোবরের পর সরাসরি ১৫ অক্টোবর চলে এসেছে। মাঝখানের ১০টা দিন, অর্থাৎ ৫ থেকে ১৪ অক্টোবর একেবারে গায়েব!

আপনি যদি এখনকার ক্যালেন্ডারে ১৫৮২ সালের অক্টোবর মাসটা খোলেন, একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পাবেন। ৪ অক্টোবরের পর সরাসরি ১৫ অক্টোবর চলে এসেছে। মাঝখানের ১০টা দিন, অর্থাৎ ৫ থেকে ১৪ অক্টোবর একেবারে গায়েব!

সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্প্রতি এই নিয়ে একটা পোস্ট বেশ ভাইরাল হয়েছে। নেটিজেনরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করছেন, ওই ১০টা দিন গেল কোথায়? সময় কি সত্যিই ১০ দিন এগিয়ে গিয়েছিল? এর পেছনে অবশ্য কোনও ভুতুড়ে বা রহস্যময় ঘটনা নেই। রয়েছে একটা দারুণ বৈজ্ঞানিক হিসাব।

৪ অক্টোবরের পর কেন ১৫ অক্টোবর?

ইউরোপের বেশিরভাগ জায়গায় ১৫৮২ সালের আগে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চলত। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার এই ক্যালেন্ডার চালু করেছিলেন। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এক বছর মানে ছিল ৩৬৫.২৫ দিন। কিন্তু পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে এর চেয়ে একটু কম সময় নেয়। এই সামান্য পার্থক্যের কারণে বছরের পর বছর ধরে ক্যালেন্ডার আর ঋতু পরিবর্তনের মধ্যে একটা বড় ফারাক তৈরি হচ্ছিল।

ছোট ভুল... কিন্তু বহু বছর পর বড় সমস্যা!

জুলিয়ান ক্যালেন্ডার এক বছরকে সৌর বছরের চেয়ে একটু বেশি ধরেছিল। শুরুতে এই পার্থক্যটা খুব একটা চোখে পড়েনি। কিন্তু কয়েক শতাব্দী পার হওয়ার পর এই ছোট ভুলটাই বড় আকার ধারণ করে। বিশেষ করে মার্চ মাসের বসন্তকাল ক্যালেন্ডারের হিসাবের চেয়ে অনেক আগেই চলে আসছিল। খ্রিস্টানদের প্রধান উৎসব ইস্টার কবে হবে, তা ঠিক করতে গিয়ে এর ফলে বেশ সমস্যা হচ্ছিল।

পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির নতুন ক্যালেন্ডার

পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি এই সমস্যার সমাধান করতে ১৫৮২ সালে একটা নতুন ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা চালু করেন। এটাই পরে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়। নতুন ক্যালেন্ডার সৌর বছরের হিসাবটা আরও নিখুঁত করে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ভুলে এতদিন ধরে যে ১০ দিনের একটা ফারাক তৈরি হয়েছিল, সেটা এক ধাক্কায় ঠিক করার দরকার ছিল।

আর সেই কারণেই ক্যালেন্ডারে একটা বড় বদল আনা হয়:

১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার)-এর ঠিক পরের দিনটা ১৫৮২ সালের ১৫ অক্টোবর (শুক্রবার) করা হয়। এভাবেই ৫ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১০টা দিন ক্যালেন্ডার থেকে পাকাপাকিভাবে মুছে ফেলা হয়। মানুষ কি তাহলে ওই ১০ দিন বেঁচে ছিল না?

এটা বেশ মজার প্রশ্ন!

মানুষের জীবন থেকে কিন্তু ১০টা দিন হারিয়ে যায়নি। ক্যালেন্ডারের তারিখগুলো শুধু বদলে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ৪ অক্টোবরের পরের দিনটাকে সরকারিভাবে ১৫ অক্টোবর হিসেবে ধরা হয়। মানুষ ১০ দিনের সময় হারায়নি, শুধু তারিখের হিসাবটা ঠিক করা হয়েছিল।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে কী বদল এল?

নতুন ক্যালেন্ডারও ১২টা মাসই রেখেছিল। মাসগুলোর দিনসংখ্যাও জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের মতোই ছিল। আসল বদলটা আসে লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষের হিসাবে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার সাধারণত প্রতি চার বছর অন্তর একটা অতিরিক্ত দিন যোগ করত। কিন্তু গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার শতাব্দী বছরগুলোর জন্য একটা বিশেষ নিয়ম নিয়ে আসে। ১০০ দিয়ে ভাগ করা যায় এমন বছরগুলো সাধারণত লিপ ইয়ার হবে না। তবে ৪০০ দিয়ে ভাগ করা গেলে সেটা লিপ ইয়ার হবে। এই নিয়ম অনুযায়ী ১৮০০ এবং ১৯০০ সাল লিপ ইয়ার ছিল না, কিন্তু ২০০০ সাল লিপ ইয়ার ছিল। এই নিয়ম ক্যালেন্ডার আর সৌর বছরের মধ্যে পার্থক্য অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

সব দেশ কি একই দিনে ক্যালেন্ডার বদলেছিল?

না। এটাও এই গল্পের একটা বড় অংশ। কয়েকটি ক্যাথলিক দেশ ১৫৮২ সালে প্রথমে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। অন্যান্য দেশগুলো কয়েক বছর বা কয়েক শতাব্দী পর এটা মেনে নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাই একই সময়ে আলাদা আলাদা ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা চালু ছিল। ক্যালেন্ডার থেকে কি তাহলে ১০ দিন সত্যিই গায়েব হয়েছিল?

হ্যাঁ, তবে সময় থেকে নয়—তারিখের হিসাব থেকে!

জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ভুল শুধরে নিতেই ১৫৮২ সালের অক্টোবরে ১০টা দিন বাদ দেওয়া হয়েছিল। আজকের দিনের ডিজিটাল ক্যালেন্ডারে ১৫৮২ সালের অক্টোবর মাসটা দেখলে সেই কারণেই ৪ তারিখের পর সরাসরি ১৫ তারিখ চোখে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই ঘটনার পেছনে তাই কোনও ম্যাট্রিক্স গ্লিচ বা টাইম ট্রাভেলের রহস্য নেই।