একদিকে সুইজারল্যান্ডে শান্তি বৈঠক চলছে, অন্যদিকে লেবাননে ইরানের 'দালাল'দের বাড়াবাড়ি বন্ধ করতে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, কথা না শুনলে ইরানের ওপর আরও ভয়ংকর হামলা চালানো হবে। যদিও আমেরিকা বলছে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু ইরানও পাল্টা শর্ত দিয়েছে।
একদিকে যখন সুইজারল্যান্ডে দ্বিপাক্ষিক শান্তি আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই ইরানকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রবিবার তিনি তেহরানকে বলেন, "লেবাননে তাদের মোটা টাকায় পোষা দালালদের অবিলম্বে থামাতে হবে", নাহলে আমেরিকার হাতে ইরানকে আবার "ভয়ংকর মার খেতে হবে"।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
ট্রাম্প তাঁর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এই হুমকি পোস্ট করেন। আল্পস পর্বতমালার দেশে (সুইজারল্যান্ডে) দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার পর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে আগ্রাসী বার্তা।
ট্রাম্প পোস্টে লিখেছেন, "ইরানকে লেবাননে তাদের মোটা টাকায় পোষা দালালদের ঝামেলা করা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। যদি তারা তা না করে, আমরা ইরানের ওপর আবার খুব কড়াভাবে হামলা করব, ঠিক যেমনটা গত সপ্তাহে করেছিলাম, শুধু এবার আরও জোরে!!!"
ইরান-আমেরিকার মউ স্বাক্ষর
এই আলোচনা এখন খুবই সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বা MoU সই হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালীর মতো কৌশলগত জলপথে যাতায়াত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধবিরতির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এই সমঝোতার মূল ভিত্তি হলো, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে উত্তেজনা কমিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।
এই আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সুইজারল্যান্ডে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি দাবি করেন, লেবানন সীমান্তে পরিস্থিতি বেশ ঘোরালো হলেও, তাঁর সরকার যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে। ভ্যান্স বলেন, "লেবাননে যুদ্ধবিরতি যাতে বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করতে গত কয়েকদিনে আমরা দারুণ অগ্রগতি দেখেছি।" তবে আলোচনার ইতিবাচক দিক তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে একাধিক যুযুধান গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা বেশ কঠিন। পরিস্থিতি যে বেশ অনিশ্চিত, তা উল্লেখ করে ভ্যান্স বলেন, "এই ধরনের যুদ্ধবিরতি সবসময়ই একটু গোলমেলে হয়।"
হোয়াইট হাউসের বর্তমান বিদেশ নীতির কথা বলতে গিয়ে ভ্যান্স আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম এশিয়ায় পুরোপুরি যুদ্ধ বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। তাঁর মতে, বৃহত্তর শান্তি চুক্তির জন্য লেবানন সীমান্তে স্থিতিশীলতা আনাটা অপরিহার্য।
ভাইস প্রেসিডেন্টের মতে, এই আলোচনা তেহরানের সঙ্গে আমেরিকার বহুদিনের তিক্ত সম্পর্কে বদল আনার একটা ঐতিহাসিক সুযোগ। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে "নতুন করে সবটা শুরু করতে" চায়, যদি তেহরানের নেতারা আমেরিকার চোখে অস্থিতিশীল বলে মনে হওয়া কাজকর্ম বন্ধ করে দেন।
আশঙ্কা ইরানের ভূমিকা নিয়ে
তবে আমেরিকার এই উদ্যোগে কিছুটা জল ঢালছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, তাদের কিছু শর্ত পূরণ না হলে তারা আলোচনার পরবর্তী ধাপে এগোবে না। ইরানের কূটনীতিকদের প্রধান দাবি হলো, লেবাননের ভেতরে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। তবেই তারা পরমাণু কর্মসূচির মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কথা বলবে। শুধু তাই নয়, আগের চুক্তি অনুযায়ী আর্থিক ছাড় ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাগুলোও দ্রুত চালু করার দাবি জানিয়েছে ইরান। এই অচলাবস্থার জন্য ইরান সরাসরি আমেরিকাকেই দায়ী করেছে। তাদের অভিযোগ, মার্চ মাস থেকে ইজরায়েলি সেনা ও হিজবোল্লাহর মধ্যে যে সীমান্ত সংঘর্ষ চলছে, তা থামাতে আমেরিকা যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে আবার নৌ-অবরোধ চালু করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শক্তি সরবরাহ এই পথেই হয়। অথচ এই মাসের শুরুতেই যে সমঝোতা হয়েছিল, তাতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি খুলে দেওয়ার কথা ছিল। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, লেবানন সীমান্তে নিরাপত্তা এবং আমেরিকার আর্থিক প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সহযোগিতা শর্তসাপেক্ষই থাকবে।

