হরমুজ প্রণালী খোলার বিনিময়ে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলার এবং নিষেধাজ্ঞা তোলার দাবি জানিয়েছিল ইরান। কিন্তু আমেরিকা সেই প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে বলে জানালেন রাষ্ট্রসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ।

হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য ইরানের দেওয়া প্রস্তাব আমেরিকা খারিজ করে দিয়েছে। রবিবার রাষ্ট্রসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানিয়েছেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার আগেই তেহরান তাদের আটকে থাকা কোটি কোটি ডলারের তহবিল এবং নিষেধাজ্ঞা তোলার দাবি করেছিল। সিএনএন-এর 'স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন' অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপত্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওয়াল্টজ বলেন, "ওরা আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমেই সব কিছু চেয়ে বসছিল।"

ইরানের হরমুজ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়, দাবি আমেরিকার

এনবিসি-র 'মিট দ্য প্রেস' অনুষ্ঠানে দেওয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে ওয়াল্টজ এই প্রস্তাবকে 'অগ্রহণযোগ্য' বলে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে আমেরিকাকে কোনও একটা চুক্তিতে আসতেই হবে। তবে ট্রাম্প সব রকম বিকল্পই খোলা রাখছেন। ওয়াল্টজ জানান, হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য সাত দিনের ওই প্রস্তাবের সঙ্গে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলারের তহবিল ব্যবহার এবং নিষেধাজ্ঞা তোলার দাবিও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি মনে করিয়ে দেন, "এগুলো শুধু আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা নয়, এগুলো বিশ্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞা। গোটা বিশ্বই এই অবস্থানে রয়েছে।"

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার প্রতিক্রিয়া

ইরানের পরমাণু কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে ওয়াল্টজ বলেন, গত ২০ বছরে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অন্তত সাতটি প্রস্তাব পাশ হয়েছে, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে ইরানের কোনও পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি থাকা উচিত নয়। তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (IAEA) নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য ইরানকে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে পাঠিয়েছে। কারণ, তেহরান তাদের দেশে পরিদর্শকদের ঢুকতে দেয়নি এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সঠিক তদারকি করতেও বাধা দিয়েছে।

তবে ইরানের বিদেশমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি এনবিসি-র 'মিট দ্য প্রেস' অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াল্টজের এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, "আমি অবাক হচ্ছি যে রাষ্ট্রদূত সাত দিনের একটা পরিকল্পনার কথা বলছেন, যেটা তিনি পড়েই দেখেননি। হয়তো তাঁকে এর কোনও কপি দেওয়াই হয়নি।"

জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ট্রাম্প

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতে আমেরিকা 'খুব শিগগিরই' জিতবে। তবে তিনি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন করে সামরিক হামলার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। রবিবার পিজিএ ট্যুর প্রেসিডেন্টস কাপের ফাঁকে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, এই সংঘাত মিটে গেলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম একধাক্কায় অনেকটা কমে যাবে। তিনি এ কথাও স্পষ্ট করে দেন যে, তেহরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে আটকানোই আমেরিকার প্রধান লক্ষ্য। ট্রাম্প বলেন, "আমার মনে হয় আমরা খুব তাড়াতাড়ি এই যুদ্ধে জিততে চলেছি। আর জিতলেই তেলের দাম যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।" আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ফের সামরিক হামলা হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, "আমি এখনই সেটা বলতে চাই না। তবে হ্যাঁ, এটা সম্ভব।"

মার্কিন নীতির মূল লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, "আসল কথা হল, ইরানের কাছে কোনও পরমাণু অস্ত্র থাকবে না।" আমেরিকা 'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট'-এর অধীনে সামরিক চাপ নাকি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সফল হচ্ছে, এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প দাবি করেন যে তারা দুই দিক থেকেই এগোচ্ছে। তিনি বলেন, "আমার মনে হয় দুটোই। আমরা দুই ভাবেই জিতব। সামরিক দিক থেকে আমরা ইতিমধ্যেই জিতে গেছি। তবে তার মানে এই নয় যে আমরা থেমে গেছি।"

কূটনীতিতেই ভরসা ইরানের

এনবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি জানান, ইরান এখনও কূটনীতির জন্য প্রস্তুত। তবে তিনি এই হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন যে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তেহরান ছেড়ে কথা বলবে না।

তিনি বলেন, "যুদ্ধ আবার শুরু হলে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। নতুন করে কোনও আগ্রাসন হলে আমরা শক্ত হাতে তার মোকাবিলা করব, তা সে যতই প্রলয়ংকরী যুদ্ধ হোক না কেন। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। আমরা শুধু আমাদের জাতীয় স্বার্থের কথা ভাবি। একই সঙ্গে আমরা কূটনীতির জন্যও তৈরি। এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেই বেছে নিতে হবে তিনি কী চান।"

আরাগচি আরও জানান, ট্রাম্পের এই প্রস্তাব খারিজ করার বিষয়টি এখনও সরকারিভাবে কোনও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তেহরানকে জানানো হয়নি। তিনি ফের স্পষ্ট করেন যে, আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান এখনও সামুদ্রিক করিডোর খুলতে রাজি।

আরাগচি বলেন, "আমরা আমাদের আটকে থাকা টাকা এবং সম্পদ ফেরত চাই। আমরা আমাদের তেল বিক্রি করতে চাই।" তিনি জানান, জুনে সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য যে সমঝোতাপত্র (MoU) সই হয়েছিল, তাতেও এই শর্তগুলোই ছিল। যদিও পরে দু'পক্ষের হামলার জেরে সেই চুক্তি ভেস্তে যায়।

আরাগচি বলেন, "আমাদের জিজ্ঞেস করলে বলব, কূটনীতিতে ফিরে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। কিন্তু আমি এখনও কূটনীতির চেষ্টা করছি, কারণ আমার মনে হয় শান্তির কোনও সুযোগই আমাদের হাতছাড়া করা উচিত নয়।"

ইরান ট্রাম্পের ধ্বংসের হুমকি এবং শান্তির প্রস্তাব খারিজ করার পরেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন মিটে যাওয়ার পর পশ্চিম এশিয়ায় উত্তাপ যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।