আজ রথযাত্রা। রথের রশিতে টান দিয়েই পাপড় ভাজা আর জিলিপির দিকে হাত বাড়ানোর সেই চিরাচরিত অছিলাটা অবশ্য ফিকে হয়ে গিয়েছে। ইঁট-কাঠের জঞ্জালে ভরা কলকাতায় আর আসে না রথের মেঘলা বিকেল। অতএব ঘরবন্দি হয়ে ইতিহাস আর মিথের পেরিস্কোপে চোখ রাখা ছাড়া প্রতিবেদকের কাছে অন্য রাস্তাও খোলা থাকে না। চলুন ঘুরে আসা যাক ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে জমা এমনই হাজারও মেলাখেলায়। 

কলকাতায় এই মুহূর্তে সাবেক রথের মেলাগুলির খোঁজ মেলা দায়।  প্রাণকৃষ্ণ দত্ত 'কলিকাতার ইতিবৃত্ত' গ্রন্থে লিখেছিলেন বৈঠকখানা বাজার থেকে লালদিঘি পর্যন্ত রথের কথা। এই বইতেই পোস্তার রথের কথাও বলা আছে। সেই সব রথের মেলাও কালের নিয়মে হারিয়ে গিয়েছে। তবে ইতিহাস বলছে কলিকাতা-সুতানুটি গোবিন্দপুর তিন গ্রামেই রথে চাপিয়ে জগন্নাথকে পথে নামানোর চল ছিল।বউবাজার অঞ্চলে গোবিন্দ সেন লেনে জগন্নাথ বিগ্রহ ও রথ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চুনিমনি দাসী প্রায় ১২৫ বছর আগে।বউবাজার অঞ্চলেই যদুনাথ দত্তের ঠাকুরবাড়িতে গত ১২২ বছর ধরে সাড়ম্বরে হয়ে আসছে রথযাত্রা।জানবাজারের রানি রাসমণির বাড়ির রথযাত্রা ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়।

অন্য খবরঃ ইসকনে রথের দড়ি টানলেন নুসরত! যাত্রাশেষে কী বললেন নুসরত

তবে বাংলা সাহিত্যে বারবার উচ্চারিত শ্রীরামপুরের মাহেশের রথটির সঙ্গে অন্য কোনও রথযাত্রার তুলনা চলে না।একদল পণ্ডিত বলেন, শ্রীচৈতন্যের অন্যতম পার্ষদ কমলাকর পিপলাই ১৫৩৩ সালে মাহেশে জগন্নাথ দেবের প্রথম সেবায়েত নিযুক্ত হন এবং সেই সময়ের কিছু আগে-পরে জগন্নাথ মন্দিরের প্রতিষ্ঠা। যদিও মন্দিরের বর্তমান সেবায়েতের দাবি মাহেশের রথযাত্রা ১৩৯৭ সাল থেকে শুরু। ১৭৯৩ সাল থেকে অনেকগুলি কাঠের রথ তৈরি হলেও ১৮৮৫ সালে মার্টিন-বার্ন কোম্পানির কারিগরি সহায়তায় ১২টি লোহার চাকাবিশিষ্ট সম্পূর্ণ লোহার কাঠামোর ৫০ ফুট উঁচু ১২৫ টন ওজনের রথটি তৈরি হয়, যা আজও পথে বেরোয়। বাংলার নবরত্ন মন্দিরের আদলে তৈরি মাহেশের রথ।

এত যার নামগান, রথে চেপে যান যে রাজা, তাঁর প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কেও নানা মত আছে। জগন্নাথ সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত পৌরাণিক ধারণাটি হল শ্রীকৃষ্ণ একটি গাছের ডালে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় জরা নামক এক শিকারি ব্যাধ দূর থেকে শ্রীকৃষ্ণের লাল পা দু’টি দেখে, লাল পাখি ভ্রমে, তা শরবিদ্ধ করলে শ্রীকৃষ্ণ ডাল থেকে নীচে মাটিতে পড়ে যান। দুঃখিত জরাকে কৃষ্ণ বলেন, কর্মফলের কারণেই এই নিয়তি তাঁর। 

এই জরাব্যাধ আদতে ছিলেন অরণ্যচারী শবরদের রাজা বিশ্ববসু। দেশের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের অনুরোধে বিশ্ববসু সংগৃহীত চিতার কাঠ রাজাকে দান করেন। রাজার দেব কারিগর বিশ্বকর্মা সেই কাঠ দ্বারা মূর্তি নির্মাণের ভার গ্রহণ করেন এই শর্তে যে, মূর্তি নির্মাণকালে কেউ তাকে বিরক্ত করতে পারবে না। অনেক দিন চলে যায়, বদ্ধ নির্মাণশালা থেকে মূর্তি নির্মাণের সাড়াশব্দ না পেয়ে অধৈর্য রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন দরজা ভেঙে নির্মাণশালায় প্রবেশ করেন। মূর্তি নির্মাণে এরূপ অনাকাঙ্খিত বাধা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্বাকর্মা মূর্তি নির্মাণ অসমাপ্ত রেখেই চলে যান। পরবর্তীকালে ব্রহ্মার আদেশে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ওই অর্ধনির্মিত মূর্তির মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের অস্থি স্থাপন করে মূর্তিতে চক্ষু, দৃষ্টি এবং প্রাণের সংস্থানপূর্বক তা আরাধনার ব্যবস্থা করেন। এই মূর্তিগুলোই হলো জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রা।  আবার অন্য একটি মতে,  আদিতে জগন্নাথ তথা নীলমাধব ছিলেন অরণ্যচারী শবর জাতি-গোষ্ঠীর উপাস্য দেবতা। এদের বিশ্বাস মৃতের অস্থি পুনঃসংযোজন করে নতুন কলেবরে গড়ে তাতে প্রাণ সঞ্চার করা যায় এবং কাঠের মূর্তির মধ্যে বৃক্ষপ্রাণ সঞ্চারিত হয়।

নুসরতকে সঙ্গে নিয়ে জগন্নাথ আরতি, মৌলবাদীদের জবাব দিলেন মমতাই, দেখুন ভিডিও

ওপরের দুটি গল্পের যেটাই সত্যি হোক না কেন একটি অব্রাক্ষ্মণ দেবতাকে ঘিরে গড়ে ওঠা উৎসবকে মাতব্বরেরা কালক্রমে উচ্চবর্ণের উৎসব হিসেবেই আটকে রেখেছিলেন। বহুকাল এই পার্বণকে  শুধুমাত্র উচ্চ-বর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যে রথযাত্রা সীমাবদ্ধ রাখা হয়। আদিতে নীলমাধব দেবতা যাদের উপাস্য দেবতা ছিলেন, সেই নিম্নবর্ণের মানুষদের অচ্ছুৎ অন্ত্যজ বলে রথের রশি ধরার অধিকার থেকে তাদের দীর্ঘ দিন বঞ্চিত করে রাখা হয়। ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্য পুরীর রথযাত্রাকে একটি আন্দোলনে পরিণত করলেন। কথিত আছে, পুরীতে একবার রথযাত্রা উপলক্ষে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ রথে আরোহণ করিয়ে সেবায়েতরা রথযাত্রার জন্য প্রস্তুত। উচ্চবর্ণের হিন্দু নরনারী, রাজ-কর্মচারীবৃন্দ রথের রশি ধরে সর্বশক্তি প্রয়োগে টানছেন কিন্তু রথের চাকা নট নড়ন-চড়ন।দেশের রাজা প্রতাপরুদ্র সপরিষদ এসে রথের রশি ধরে আকর্ষণ করতে লাগলেন; তথাপি রথের চাকা নড়ে না। এই অবস্থায় চৈতন্যের নিদান শবর তথা নিম্নবর্গীয় মানুষদের রথের রশি ধরার সুযোগ দিতে হবে। তবে ঘুরবে চাকা। অনেক টালবাহানার পর সমাজে পিছিয়ে থাকা অচ্ছুৎ অন্ত্যজদের রথের রশি ধরার অনুমতি মিলল। সমাজের অন্য সবার শক্তির সঙ্গে যেই যোগ হলো তথাকথিত অন্ত্যজদের শক্তি। রথের চাকা এগিয়ে চলল সামনের দিকে। অন্ত্যজের স্বীকৃতি স্বরূপ এই অনুষ্ঠানে ভোগে আজও তাই কোনও আড়ম্বর থাকে না। পুরীতে এই দিন লক্ষ মানুষ পাত পেরে খায় কচুর শাক আর মোটা চালের ভাত!

একটা অন্য দ্বিধার কথা বলি, ভক্তকুল মনে করে এই দিনটিই রথে চেপে জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি যাওয়ার দিন। সেই মত নিজেদের ভক্তিপরবশ হৃদয়কে তারা প্রস্তুত করে। তবে এই দিনটি প্রেমের দিনও হতে পারত। কারণ ইতিহাস বলছে, রথযাত্রা আসলে জগন্নাথের বান্ধবী পৌর্ণমাসীর বাড়ি যাওয়ার দিন। পৌর্ণমাসী কালে কালে কীভাবে জগন্নাথের মাসি হয়ে গেলেন তা জানা নেই। 

রথের অনুষ্ঠানে এত আনন্দ, এত আমেজ, অথচ তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বিশেষ বিষাদও। চৈতন্য ভক্তদের একটা বড় অংশ মনে করেন,  জয়ানন্দের(চৈতন্যমঙ্গল) ‘রথ বিজয়া নাচিতে/ইটাল বাজিল বাম পায়ে আচম্বিতে’ তত্ত্বটিই সত্য। অর্থাৎ রথযাত্রার সময় পায়ে ইটের টুকরো বিঁধে সেই অংশে টিটেনাস হয়ে মারা যান মহাপ্রভু। মহাপ্রভুর অন্ত্যলীলার প্রত্যক্ষদর্শী মাধব পট্টনায়ক ১৫৩৫-এ লেখেন বৈষ্ণবলীলামৃত। তাতে বলা হচ্ছে :

বাজে ইটাএ  পড়িথিলা তাহকি দৃষ্টি ত না থিলা।।
বাজিলা বাম বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি । রুধির ঝরই নিকিটি।
পদখঞ্জাই মোড়ি হেলা। গলবাজি তলে পড়িলা।

 
অর্থাৎ উদ্দাম নৃত্যে বিভোর চৈতন্য হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে পথে পড়ে থাকা ইটের টুকরোয় আঘাত পেলেন, শুরু হল অঝোর রক্তপাত। এইসময়ে রুক্মিণী অমাবস্যার সেই রাতে পদদলিত প্রভুকে ভক্তরা বয়ে এনে উত্তর মন্দিরের চাতালে শুইয়ে দেন। তবে কৃষ্ণদাস কবিরাজ অন্য কথা লিখেছিলেন। পরবর্তীতে অমৃতলাল শীল, নীহাররঞ্জন রায়, জয়দেব মুখোপাধ্যায় অন্ধকার গুমঘর থেকে তথ্য তুলে এনে দেখান এই সবই মিথ্যে। আদতে চৈতন্য খুন হন। কী ভাবে? তাই নিয়ে কথা হবে অন্য কোথাও অন্য কোনওখানে।

ছবি সৌজন্যঃ প্রদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়