বাংলা বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। নবাবি আমল থেকেই বর্তমান সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই তত্ত্বই বার বার উঠে আসে। আজ বাংলা জুড়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, গৈরিকীকরণের রাজনীতি চলছে, তার জন্য দায়ী আরএসএস এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। 

এই ভাষাতেই ফের একবার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে নিশানা করলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। বাঙালির বাঙালিত্ব নিয়ে এক বিতর্কসভার আয়োজন করেছিল ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ। যার মূল বক্তা ছিলেন অমর্ত্য সেন। সেখানে তিনি বাঙালির বাঙালিত্বকে বোঝাতে গিয়ে একদিকে যেমন মাগধি, প্রাকৃতের উদ্ভব ইতিহাসকে টেনে এনেছেন, তেমনই রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে মুকুন্দ রামের চণ্ডীমঙ্গল তারও অবতারণা করেছেন। এমন কী, ১২০০ থেকে ১৩০০ শতকের মধ্যে যে বাংলা শাসনতন্ত্র এবং তার পতন থেকে শুরু করে নবাবি আমলের উন্মেষ, পরবর্তীকালে পলাশির যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলার বুকে ব্রিটিশ শক্তির উত্থান- সবেতেই তিনি বাঙালির বাঙালিত্বকে অসাম্প্রদায়িকতার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন।  

আরও পড়ুন- জয় শ্রীরাম নিয়ে অমর্ত্য সেন দিলীপ ঘোষ কাজিয়া, তীব্র প্রতিক্রিয়া দিলেন সাংসদ

আরও পড়ুন- 'অমর্ত্য সেনের জ্ঞানে কিছু যায় আসে না', দিলীপের রোষে নোবলজয়ী অর্থনীতিবিদ, দেখুন ভিডিও

তিনি বলেন, বাংলার অতীত ইতিহাস থেকেই বার বার দেখা গিয়েছে হিন্দু ও মুসলিমরা পরস্পরের সহযোগী ও পরিপূরক হয়ে বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। অধ্যাপক সেনের ভাষায় একটা মিউচুয়াল কোঅপারেশন। নবাবি আমলে কীভাবে বাংলার ঘরে ঘরে রামায়ণ মহাভারতের কাহিনি ছড়িয়ে পড়েছিল, তারও প্রমাণ টেনে আনেন অমর্ত্য সেন। এমন কী, নবাবরা সান্ধ্যকালে রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে বাংলায় অনুবাদ করা রামায়ণ, মহাবারতের কাহিনি শুনতেন বলেও জানান অমর্ত্য সেন। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ের কথা মনে করিয়ে অমর্ত্য সেন বলেন, 'বাংলার বুকে ১৯৪৬ সালে কলকাতার বুকে দ্য গ্রেট ক্যালকাটা ম্যাসাকারের মতো ঘটনাও ঘটেছে, হয়েছে দাঙ্গা। তবুও বাংলার সমাজজীবন থেকে হিন্দু ও মুসলিমদের সহযোগিতামূলক অবস্থানকে কোনওভাবেই নষ্ট করা যায়নি। এর আরও বেশি প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের জন্ম থেকে। ভারতবর্ষ ভাগ করে এবং বাংলার অর্ধেক কেটে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান নামে একট ভূখণ্ড তৈরি করা হলেও তা কিন্তু কোনওভাবেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। যার জেরে জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের। এবং এই রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্রেও রয়েছে বাংলার হিন্দু ও মুসলিমদের পারস্পরিক সহযোগিতা।'

বাংলার অসাম্প্রদায়িকতায় আরও এক বড় ইন্ধন জুগিয়েছেন বৌদ্ধরা। এমনটাও তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। সুতরাং, আজ বাংলার বুকে যে এক সাম্প্রদায়িক আবহওয়া তৈরি করার চেষ্টা চলছে, তা বাঙালির মানসিকতার সঙ্গে খাপ খায় না।  বাঙালির বাঙালিত্বকে ধরে রাখতে হলে এবং অসাম্প্রদায়িকতার ইতিহাসকে অটুট রাখতে হলে যে গৈরিকিকীরণের রাজনীতি চলছে, তাকে অবজ্ঞা করার মতো সাহস দেখাতে হবে সাধারণ মানুষকে। এমনই মন্তব্য অমর্ত্য সেন। 

অতীতে বার বার নিজের এমন মতামত দিয়ে গেরুয়া শিবিরের রোষের মুখে পড়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। কিন্তু তাতে যে তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরছেন না, একবার ফের তা বুঝিয়ে দিলেন প্রবীণ এই অধ্যাপক।