আসছে দুর্গাপুজো। এর পিঠোপিঠি আবার লক্ষ্মী ও কালী পুজো। ফলে এখন শ্বাস ফেলার সময় নেই কুমোরটুলির। সেখানে মূর্তি তৈরির কারিগরদের মধ্যে দুর্গা প্রতিমা বানানোর জোর তোড়জোড়। অনেকে আবার কালী প্রতিমাও বানাতে শুরু করেছেন। পুজোর এহেন ব্যস্ততায় তবে এখন নজর কেড়েছে রাম-এর একটি ত্রিশ ফিটের মূর্তি। যার সঙ্গে রয়েছে সীতা ও লক্ষ্মণ-ও। কিন্তু দুর্গাপুজোর মধ্যে এই বিশাল রাম মূর্তি-র বরাত দিল কে? প্রশ্ন করতেই ধেয়ে এল চমকদার উত্তর। উত্তরদাতা দাবি করলেন এই মূর্তির বরাত এসেছে প্রদেশ বিজেপি-র কাছ থেকে! 

রামের সঙ্গে সঙ্গে সীতা ও লক্ষ্মণের মূর্তির উচ্চতাও ত্রিশ ফিট হবে। রাম মূর্তির নির্মাণে ব্যস্ত থাকা মৃৎশিল্পী জানালেন প্রত্যেকটি মূর্তি হবে ফাইবারের। ইতিমধ্যেই সীতার মূর্তির ডাইস বানানো হয়ে গিয়েছে। এখন রামের মূর্তির ডাইস বানানোর কাজ চলছে। এই ডাইস বানানোর প্রথম ধাপে মাটির মূর্তি গড়়া হয়। সেই মাটির মূর্তি থেকে তৈরি করা হয় ডাইস। একইভাবে লক্ষ্মণের মূর্তি-র ডাইসও তৈরি করা হবে জানান। কিন্তু নাম জিজ্ঞেস করতেই পিছু-পা মৃৎশিল্পী। তিনি নাম বলবেন বলে জানিয়েই দিলেন। পঞ্চাশ ফিট উচ্চতার এই মূর্তিগুলি বসবে কোথায়? মৃৎশিল্পী স্পষ্টতই জানিয়ে দেন, কলকাতা শহরের কোথাও বসানো হবে বলে তিনি শুনেছেন। তবে, সঠিকভাবে স্থানের নাম তাঁর জানা নেই। এতকিছু জিঞ্জেস করতেই মৃৎশিল্পীরও পাল্টা প্রশ্ন। আপনারা কি রিপোর্টার মানে সাংবাদিক! গলায় ঝোলানো আই কার্ড তুলে ধরতেই মৃৎশিল্পীর আর মুখে রা নেই। তবে মৃৎশিল্পী এটা জানিয়েই দিলেন, তিনি ঘুরে ঘুরে এইসব কাজ করেন। কুমোরটুলি-র এই কারখানায় তাঁকে ডাকা হয়েছে এই মূর্তি বানানোর জন্য তাই তিনি এসেছেন। এর বাইরে যা বলার স্টুডিও-র মালিক রাজা পাল-ই বলতে পারবেন। 

অগত্যা রাজা পালের খোঁজ। জানা গেল ওই গলির মুখেই তাঁর বাড়ি। রাজা পালের স্টুডিও-র পাশেই রাজা-র দাদা প্রজা পাল-এর স্টুডি। তিনি জানালেন, রাজা এখন নেই। রাম মূর্তি নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি দাবি করলেন, বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের নাম করে দিন পনেরো আগে কয়েক জন এই মূর্তির বরাত দিয়ে গিয়েছেন। ত্রিশ ফুটের রাম-সীতা ও লক্ষ্মণের মূর্তি-র ডেলিভারি ডেট কবে? প্রজা পাল জানিয়ে দিলেন, এই নিয়ে কোনও চূড়ান্ত তারিখ দেওয়া হয়নি। যত দ্রুত সম্ভব মূর্তিগুলি বানাতে বলা হয়েছে। মূর্তিগুলির জন্য বেশকিছু অর্থ অগ্রিমও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু, এই অর্থের পরিমাণ কত তা তাঁর জানা নেই। ওটা বরাত নেওয়া তাঁর ভাই রাজা-ই বলতে পারবেন বলে দাবি করেন প্রজা। 

কুমোরটুলিতে রাম-সীতা ও লক্ষ্মণের মূর্তির বরাত নিয়ে এশিয়ানেট নিউজ বাংলা-র পক্ষ থেকে বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ দিলীপ ঘোষকে ফোন করা হয়েছিল। সংসদ অধিবেশন চলার জন্য এই মুহূর্তে দিল্লি-তে রয়েছেন দিলীপ ঘোষ। তিনি এশিয়ানেট নিউজ বাংলার প্রতিনিধি-কে সাফ জানিয়ে দেন কুমোরটুলি-তে রাম-সীতা-লক্ষ্মণ-এর মূর্তির বরাতের কথা তাঁর জানা নেই। এমন কোনও মূর্তি তৈরির বরাত তিনি দিয়েছেন বলে খেয়ালও পড়ছে না বলে জানিয়ে দেন দিলীপ ঘোষ। সেইসঙ্গে তিনি জানান, মন্দির ও মূর্তি নিয়ে রাজনীতি করার দরকার তাঁর পরে না। যাদের কালো টাকা আছে তারাই এইসব মূর্তি তৈরি করাতে পারে। এমন মূর্তি গড়ার মতো অর্থ তাঁর কাছে নেই বলেও সাফ জানিয়ে দেন বিজেপি সাংসদ। 

লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই জয় শ্রীরাম ধ্বনি নিয়ে বারবার উত্তপ্ত হচ্ছে রাজ্য রাজনীতি। ইতিমধ্যে জয় শ্রীরাম বলা এবং না বলা নিয়ে বেশকিছু গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যু হয়েছে বেশ কয়েক জনের। রোজই জয় শ্রীরাম নিয়ে তপ্ত হচ্ছে পরিস্থিতি। সংসদেরও নবনির্বাাচিত সাংসদদের শপথ গ্রহণেও ধ্বনিত হয়েছে জয় শ্রীরাম স্লোগান। সম্প্রতি জয় শ্রীরাম নিয়ে হিংসার ঘটনার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিদ্বজনেদের একটি দল কেন্দ্রকে চিঠি দিয়েছে। পাল্টা আবার ৬৭ জন বিদ্বজনরাও এই চিঠির বিরোধিতা করে কেন্দ্রকে লিখিত বিবৃতি দিয়েছে। ফলে জয় শ্রীরাম নিয়ে যখন এতটা উত্তপ্ত পরিস্থিতি তখন কুমোরটুলি-র বুকে রাম-সীতা ও লক্ষ্মণের মূর্তি তৈরির বরাত যাওয়া স্বাভাবিকভাবে কৌতুহলের উদ্রেক করতে বাধ্য। এখন প্রশ্ন বিজেপি যদি এই বরাতের সঙ্গে জড়িত না থাকে তাহলে বরাতটা দিল কে?