সবুজ মুখোপাধ্যায়: শরদিন্দুর 'পথের কাঁটা' মনে আছে তো? এক অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতী, গ্রামাফোনের পিন বিঁধিয়ে কেমন সুকৌশলে একের-পর-এক খুন করে গিয়েছিলেন?
শরদিন্দু লিখছেন: "মাস দেড়েক পূর্বে সুকীয়া স্ট্রিট নিবাসী জয়হরি সান্ন্যাল নামক জনৈক প্রৌঢ় ভদ্রলোক  প্রাতঃকালে কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট দিয়া পদব্রজে যাইতেছিলেন। রাস্তা পার হইয়া অন্য় ফুটপাথে যাইবার জন্য় যেমনই পথে নামিয়াছেন, অমনই হঠাৎ মুখ থুবড়িয়া পড়িয়া গেলেন। সকালবেলা রাস্তায় লোকজনের অভাব ছিল না, সকলে মিলিয়া তাঁহাকে ধরাধরি করিয়া তুলিয়া আনিবার পর দেখিল  তাঁহার দেহে প্রাণ  নাই। হঠাৎ কীসে মৃত্য়ু হইল, অনুসন্ধান করিতে গিয়া চোখে পড়িল যে, তাঁহার বুকের উপর একবিন্দু রক্ত লাগিয়া আছে-- আর কোথাও আঘাতের  কোনও চিহ্ন নাই। পুলিশ অপমৃত্য়ু সন্দেহ সন্দেহ করিয়া লাস হাসপাতালে পাঠাইয়া দিল। সেখানে মরণোত্তর পরীক্ষায় ডাক্তার এক অদ্ভুত রিপোর্ট দিলেন। তিনি লিখিলেন, মৃত্য়ুর কারণ হৃৎপিণ্ডের মধ্য়ে একটি গ্রামাফোন পিন  বিঁধিয়া আছে। কেমন করিয়া  এই পিন হৃদপিণ্ডের মধ্য়ে প্রবেশ করিল, তাহার কৈফিয়তে বিশেষজ্ঞ অস্ত্র চিকিৎসক লিখিলেন, বন্দুক বা ঐ জাতীয় কোনও যন্ত্র দ্বারা নিক্ষিপ্ত এই পিন মৃতের সম্মুখ দিক্ হইতে বক্ষের চর্ম ও মাংস ভেদ করিয়া মর্মস্থানে প্রবেশ করিয়াছে এবং মৃত্য়ুও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হইয়াছে।...
'দৈনিক কালকেতু' লিখিল-- আবার গ্রামাফোন পিন/ অদ্ভুত রোমাঞ্চকর রহস্য় / কলিকাতার পথঘাট নিরাপদ নয়"।


১৯৩২ সালে শরদিন্দু বন্দ্য়োপাধ্য়ায় লিখেছিলেন ব্য়োমকেশের রহস্য় রোমাঞ্চকর গল্প 'পথের কাঁটা'।  সেখানেই বাঙালি পাঠক প্রথম এহেন অভিনব খুনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। অভিনব-- কারণ, একে তো গ্রামাফোন পিন দিয়ে একের-পর-এক খুন করা। তারওপর রয়েছে তার আরও অভিনব পদ্ধতি। বন্দুক নয়, কিছু নয়। খুনী স্রেফ একটা সাইকেলের বেলের ভেতর থাকা পাকানো স্প্রিংয়ের সাহায্য়ে এই খুন করে যেত! সেই খুনের রহস্য় ভেদ করে শেষে বন্ধু অজিতকে বলছে ব্য়োমকেশ-- "এ রকম একটা যন্ত্র তৈরি করা যায়, এ কল্পনাও বোধ করি আজ পর্যন্ত কারুর মাথায় আসেনি। এই যে পাকানো স্প্রিং দেখছ, এটি হচ্ছে বন্দুকের বারুদ,-- কি নিদারুন শক্তি এই স্প্রিং-এর! কি ভয়ঙ্কর অথচ কি সহজ। এই ছোট্ট ফুটোটি হচ্ছে এর নল,-- যে পথ দিয়ে গুলি বেরোয়। আর এই ঘোড়া টিপলে দু`কাজ একসঙ্গে হয়, ঘণ্টিও বাজে গুলিও বেরিয়ে যায়। ঘণ্টির শব্দে স্প্রিং-এর আওয়াজ চাপা পড়ে।"
অভিজ্ঞতা বলে-- ঘটনা ঘটে আগে আর তার পিছন পিছন দৌড়োয় কল্পনার গল্প আর উপন্য়াস। বাস্তব, রসদ জোগায় কল্পনাকে। আর সেই কল্পনাকে সম্বল করে কলম ধরেন লেখক।  (যদি-না তা চাঁদের যাওয়ার মচো কোনও কল্পবিজ্ঞান হয়। যেখানে বাস্তবকে আগেই প্রেডিক্ট করতে পারেন লেখক।) কিন্তু, গোয়েন্দা গল্প পড়ে খুনি তার অভিনব খুনের পরিকল্পনা করে আর সে খুনের কিনার করতে রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যেতে হয় লালবাজারের দুঁদে গোয়েন্দাদের, এমন ঘটনা কিন্তু বিরলের মধ্য়ে বিরল। 


তাই, এ ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল, তাকে ইংরিজিতে কোইনসিডেন্স বলবেন নাকি বাংলায় কাকতালীয় বলবেন, তা ঠিক করা ভারি মুশকিল। কারণ, ১৯৩২ সালে শরদিন্দুর মাথায় খুনের যে অভিনব প্লট বের হয়েছিল, অনেকটা সেই  একই কায়দায় তার ঠিক এক বছর পরেই এমন একটি খুনের ঘটনা ঘটেছিল  কলকাতায়, যা শুনে বিচারক পর্যন্ত বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন--  অপরাধ তথা খুনের ইতিহাসে এই ঘটনা সম্ভবত অভিনব ( Probably unique in the annals of crime)। যাকে বলা হয়েছিল, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে ব্য়ক্তিগত জৈবসন্ত্রাসের অন্য়তম প্রথম ঘটনা  ( One of the first cases of individual bioterrorism in modern world history)। ভাবা যায়,  শরদিন্দুর রহস্য গল্পের ভিলেন প্রফুল্ল রায় যে কায়দায় খুন করেছিলো 'পথের কাঁটা'য়, অনেকটা সেই একই কায়দায় ভারত তথা বিশ্বের প্রথম 'জীবাণু হামলা'র ঘটনা ঘটেছিল খাস কলকাতার বুকে! 
 ১৯৩৩ সালের এই কুখ্য়াত খুনের ঘটনাটি এখনও কেউ কেউ মনে রেখেছেন, 'পাকুড় হত্যাকাণ্ড' বা 'অমরেন্দ্র পাণ্ডে হত্যাকাণ্ড' নামে। কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার সুপ্রতিম সরকারের লেখা বই 'গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার'-এও অনেকে পড়েছেন  এই ঘটনার কথা।  যা আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এই করোনার মরশুমে। কারণ, বলাই বাহুল্য়, কোভিড-১৯ ভাইরাসটি নাকি গবেষণাগারে নিষ্ঠার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করা হচ্ছিল রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে, জীবাণু হামলার উদ্দেশ্য়ে, চিনের বিরুদ্ধে আপাতত এই অভিযোগে তোলপাড় গোটা বিশ্ব। যদিও এই ঘটনার কোনও অথেনসিটি বা প্রামাণ্য় নথি এখনও পাওয়া যায়নি, তবু, রাসায়নিক অস্ত্র বা জীবাণু হামলার প্রশ্নটি আবারও উঠে এসেছে করোনা অতিমারীকে সামনে রেখে। 
কী ঘটেছিল সেদিন কলকাতায়? 


শীতকালের হাওড়া স্টেশন। ১৯৩৩ সাল। নভেম্বর মাসের ২৬ তারিখ। কলকাতা থেকে পাকুড় ফিরছেন পাকুড় রাজপরিবারের ছোটকর্তা অমরেন্দ্র নাথ পাণ্ডে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বোন বনমালা আর দাদা বিনয়েন্দ্র। অমরেন্দ্রর বয়স  তখন মাত্র  কুড়ি। বাবা মারা গিয়েছেন গত বছর। তা যাই হোক,  ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস কামরায় ওঠার আগে চলছে সি-অফের পালা।  হঠাৎ করে কোথাও কিছু নেই একটা চোয়াড়ে গোছের লোক অমরেন্দ্রকে ধাক্কা মেরে চলে  গেলো আর সঙ্গে সঙ্গে প্ল্য়াটফর্মে দাঁড়িয়েই অমরেন্দ্র  বলে উঠলেন-- উফ্, লোকটা কী একটা ফুটিয়ে দিয়ে চলে গেল। যদিও, তখনও কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাননি এরপর ঠিক কী ঘটতে চলেছে। 


অমরেন্দ্রর বোন বলে উঠলো-- থাক, আর পাকুড় গিয়ে কাজ নেই। কিন্তু সামান্য় একটা কাটা-ছেঁড়ার ঘটনাকে তেমন আমল দিলেন না অমরেন্দ্র। যদিও অমরেন্দ্রর হাত থেকে সাদাটে ধরনের একটা তরল পদার্থ বেরোচ্ছিল তখন আর পাঞ্জাবির হাতা ভিজে যাচ্ছিল। আস্তিন গুটিয়ে অমরেন্দ্র দেখলেন, হাতের ওপর একটা ছোট্ট ক্ষতচিহ্ন। এই অবস্থায় ট্রেনে করে  পাকুড়ে রওনা হলেন সবাই। কিন্তু পাকুড়় রাজবাড়িতে পৌঁছিয়ে ধুম জ্বর এলো অমরেন্দ্রর। একদিনের মধ্য়েই কাহিল হয়ে পড়লেন অমরেন্দ্র। জ্বর বাড়তে লাগলো।  চিকিৎসার জন্য় অমরেন্দ্রকে কলকাতায় নিয়ে আসা হলো রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের (তখন সেই রাস্তার ওই নামকরণ হয়নি) একটি ভাড়া বাড়িতে।   সেই সময়ের প্রখ্য়াত চিকিৎসক ডা. নলিনীরঞ্জন সেনগুপ্তকে 'কল' দেওয়া হল।  ততক্ষণে হাত ফুলে গিয়েছে অমরেন্দ্রর। ১০৫ ডিগ্রির ওপর জ্বর আর তা নামছে না কিছুতেই। ক্রমশ হার্টবিট চলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। রক্তপরীক্ষার কথা বললেন নলিনীরঞ্জন। রক্তের নমুনা নেওয়া হলো। তার পরেরদিনই জ্ঞান হারালেন অমরেন্দ্র।  ব্লাড কালচারের রিপোর্ট আসার আগেই ৪ ডিসেম্বর মারা গেলেন পাকুড় রাজবাড়ির  এই ছোটপুত্র। 


বলে রাখা ভালো,  সে যুগে রক্তপরীক্ষা কিন্তু মুখের কথা ছিলো না। তাই ক-দিন  সময়ও লাগলো তার রিপোর্ট আসতে। আর এক বাঙালি চিকিৎসক সন্তোষকুমার গুপ্ত রক্ত পরীক্ষার করলেন।  কিন্তু সেই রিপোর্ট পড়়ে তো একেবারে স্তম্ভিত সব চিকিৎসকরা। অমরেন্দ্রর রক্তে প্লেগের জীবাণুর সংক্রমণ ঘটেছে! কিন্তু দেশের কোথাও  তখন প্লেগের রোগী নেই এবং একজনও কেউ মারা যায়নি ওই অসুখে। তাহলে!  টালিগঞ্জ থানায় একটি অস্বাভাবিক মৃত্য়ুর অভিযোগ দায়ের করা হলো। টালিগঞ্জ থানায় সেই কেস নম্বর হল-- ৬৭। ১৭/ ২/ ৩৪। আর, ৩০২ ও ১২০-বি ধারায় আনা হলো খুন ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। কলকাতা তথা গোটা দেশে আলোড়ন পড়ে গেল।  লালবাজারের দুঁদে গোয়েন্দা শরৎচন্দ্র মিত্র ঘটনার তদন্তভার হাতে তুলে নিলেন।  
খুনী কে, তা বের করার কোনও সূত্র হাতের কাছে না-থাকলেও খুনের মোটিভ সম্পর্কে তেমন কোনও ধন্দ ছিলো না গোয়েন্দাদের। রাজ পরিবারেরর বিপুল সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা হলে অমরেন্দ্রর মৃত্য়ুতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতেন  দাদা বিনয়েন্দ্র চন্দ্র পাণ্ডে। যিনি খুবই উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতেন বলে খবর পাওয়া গেল। আরও অনেক তথ্য় হাতে এলো। কিন্তু খুনটা হলো কীভাবে?


তদন্তে উঠে এলো এক ভয়াবহ তথ্য়। কলকাতার স্কুল অব ট্রপিকাল মেডিসিনের গবেষকরা জানালেন, সূঁচের মধ্য়ে করে প্লেগের জীবাণু মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল অমরেন্দ্রর রক্তে! এ-ও জানা গেল, সেই সময়ে হপকিনসের এক বাঙালি চিকিৎসক ছিলেন  তারানাথ ভট্টাচার্য। যিনি ঘটনাচক্রে বিনয়েন্দ্রর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুও বটে।  আদতে কিন্তু তারানাথ ছিলেন একজন ভুয়ো ডাক্তার। অমরেন্দ্রর ওপর জীবাণু হামলার আগে বিনয়েন্দ্র বেশ কয়েকবার মুম্বই পাড়ি দিয়েছিলেন বলেও জানতে পারলেন তদন্তকারীরা। তদন্তে উঠে এলো, বিনয়েন্দ্র হপকিনসের কিছু  কর্মকর্তাকে এক প্রকার উৎকোচ দিয়েই কিন্তু তারানাথের নিয়োগ পাকা করে ফেলেন সেখানে। কিন্তু কেন হপকিনস? মুম্বইয়ের ওই  হাসপাতালে তখন চলছিল প্লেগের ওষুধ বা ভ্য়াকসিন নিয়ে গবেষণার কাজ। স্বভাবতই, গবেষণার স্বার্থে সেখানে মজুত ছিল প্লেগের জীবাণু। জীবাণু গোপনে পাচার করলেন তারানাথ। যদিও তার আগে ইঁদুরের ওপর প্রয়োগ করলেন আর সেই ইঁদুরগুলোও কিছুক্ষণের মধ্য়েই মরে গেলো! এরপর তারানাথ এমন একটা বন্দোবস্ত করলেন, যাতে করে একটা ইঞ্জেকশন সিরিঞ্জ বা সূঁচজাতীয় কিছুতে করে তা অমরেন্দ্রর রক্তে ওই জীবাণু মিশিয়ে দেওয়া যায়! আর তারপরই ঘটলো হাওড়া স্টেশনের সেই ঘটনা। 


মামলা উঠলো কলকাতা হাইকোর্টে। তদন্তে প্রমাণিত হলো, সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারার কারণেই ছোট ভাই অমরেন্দ্রকে  এই অভিনব উপায় খুন করিয়েছিলো দাদা বিনয়েন্দ্র। আসামীদের দোষী সাব্য়স্ত করার সময়ে বিচারপতি বিস্মিত হয়ে বললেন--  অপরাধ তথা খুনের ইতিহাসে এই ঘটনা সম্ভবত অভিনব ( Probably unique in the annals of crime)।  বিনয়েন্দ্র ও তারানাথকে ফাঁসির হকুম দিলো আদালত। ফাঁসির আসামীরা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলে তাদের আন্দামানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিলেন বিচারপতি। কিন্তু...।
একটা 'কিন্তু' থেকেই গেলো। হাওড়া স্টেশনে যে লোকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে সুকৌশলে অমরেন্দ্রর শরীরে সূঁচ বিঁধিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিলো, তাকে আর ধরতে পারলো না পুলিশ। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল শরদিন্দুর 'পথের কাঁটা'তে। পুলিশের বড়কর্তারা ধরতে পারেননি প্রফুল্ল রায়কে। একমাত্র ব্য়োমকেসের অসামান্য় দক্ষতায় গ্রামাফোন পিনের সেই অপরাধী ধরা পড়েছিল এবং গ্রেফতার হওয়ার আগেই সে আত্মহত্য়া করেছিল। 

আরও একটা 'কিন্তু'  থেকে গেলো ঘটনার  ৯০ বছর পরও। যা, হয়তো আগামী ৯০ বছর পরেও 'কিন্তু'ই থেকে যাবে। আর তা হলো, অমরেন্দ্র  আর তারানাথ কি একবছর আগে প্রকাশিত  শরদিন্দুর 'পথের কাঁটা' পড়েই পিন বা সূঁচজাতীয় কিছু ফুটিয়ে অমরেন্দ্রকে খুন করার অমন অভিনব পরিকল্পনা করেছিল? 
কোভিড-১৯ আর চিনকে ঘিরে যে প্রশ্ন উঠেছে, একদিন হয়তো তারও সত্যাসত্য জানা যাবে। কিন্তু কোনওদিন জানা যাবে না এই প্রশ্নের উত্তর।