খিদিরপুরে ভূকৈলাস রোডে একেবারে বস্তি এলাকাতেই থাকে ওরা - লাভলি ও আলি। এখনও প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পার করেনি। কোনওদিন জিমন্যাস্টিক্সের কোনও ট্রেনিং-ও নেয়নি ওরা। কিন্তু এই দুই পুঁচকের স্কুল ড্রেসে কাঁদে ব্যাগ নিয়ে রাস্তাতেই দেওয়া সমারসল্ট ও কার্টহুইলে মুগ্ধ জিমন্য়াস্টিক্সের রানী নাদিয়া কোমানেচি থেকে ক্রিড়ামন্ত্রী কিরেন রিজিজুও।

জিমন্যাস্টিক্স ওরা করে না, শেখে নাচ। আর নাচের প্রয়োজনেই ওদের কার্টহুইল, সমারসল্ট করা শিখিয়েছিলেন তাদের নাচের শিক্ষক শেখর রাও। তারপর থেকে প্রায়ই রাস্তায় জিমন্যাস্টিক্সের কিছু কসরত করত ওরা। তার জন্য মা-বাবা থেকে নাচের শিক্ষক সবার কাছেই বকুনি খেত। তাদের এই অভ্যাস দূর করা জন্যই শেখর চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, স্কুলের পোশাকে কাঁধে স্কুলের ব্যাগ নিয়েই সেই কসরত করার।

শেখর জানিয়েছেন, তাঁর ধারণা ছিল, ওরা এটা করতে পারবে না। তারপরই আরও বকুনি দিয়ে রাস্তায় জিমন্যাস্টিক অভ্যাস করার বিপদ সম্পর্কে ওদের বোঝাবেন। কিন্তু, তাঁকে বিস্মিত করে দেয় লাভলি ও আলি। দুজনেই জিতে নেয় সেই চ্যালেঞ্জ। এরপর সেই ভিডিও সোশ্য়াল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন শেখর।

বহু হাত ঘুরে তা পৌঁছেছিল অলিম্পিকে প্রথম 'পারফেক্ট টেন' করা প্রাক্তন রোমানিয় জিমন্য়াস্ট নাদিয়া কোমানাচির কাছে। তিনিও সেই ভিডিও পোস্ট করে বিস্ময় ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

তবে শুধু কোমানাচি নয়, এই ভিডিও নজর কেড়েছে ভারতের ক্রীড়ামন্ত্রী কিরেন রিজিজু থেকে শুরু করে বহু মানুষেরই। আপাতত সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছে এই দুই পুঁচকে। কিরেন রিজিজু নিজে টুইট করে কলকাতার ছেলে মেয়ে লাভলি ও আলির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী ও অলিম্পিকে রুপোজয়ী রাজ্যবর্ধন সিং রাঠোর বলেছেন এই ভিডিও দেখিয়ে দিচ্ছে ভারতের ক্রীড়া সিস্টেম কতটা শক্তিশালী।

তবে সত্যিই কি লাভলি ও আলি ভারতের ক্রীড়া সিস্টেমের দান? এই প্রশ্নটা উঠছে, কারণ লাভলির মা রেশমা খাতুন জানিয়েছেন কতটা কষ্ট করে বড় হচ্ছে তারা। তিনি জানিয়েছেন, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে থেকে ছেলেমেয়েদের জিমনাস্টিক শেখানোটা তাঁদের কাছে বিলাসিতা। মেয়ে নাচের স্কুলে যেতে চাইলে আগে বাধাই দিতেন তিনি। তাও নাচের টানে লাভলি সকালে উঠে বাসন মেজে, ঘর ঝাড় দিয়ে তারপরই যেত নাচ শিখতে। থাকেনও এমন এক বস্তিতে যেটা সরকার যে কোনও দিন তুলে দিতে পারে। আর্থিক সমস্যার পাশাপাশি তাঁরা মুসলিম বলে, তাদের ঘরের মেয়েদের নাচ বা জিমনাস্টিক্স করা নিয়ে অনেক রক্ষণশিলতাও রয়েছে।

এখন অবশ্য অবস্থাটা অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। কোমানাচির মতো জিমন্য়াস্ট বা কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রীর আগ্রহ দেখে তিনি বুঝতে পেরেছেন তাঁর মেয়ের মধ্যে প্রতিভা রয়েছে। তাই এখন সেই প্রতিভার বিকাশ হোক সেটাই মায়ের মনোবাঞ্ছা। তবে জিমনাস্টিক্স চালিয়ে যেতে গেলে নিয়মিত যে পুষ্টিকর খাওয়ারের বন্দোবস্ত করতে হয়, বা আরও বিভিন্ন খরচ রয়েছে, তা বহন করা তাদের পরিবারের পক্ষে যে সম্ভব নয় তাও স্বীকার করে নিয়েছেন।

এখানেই সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী তথা বাংলার প্রাক্তন  ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্লা। লক্ষ্ণী লাঙলির মাকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। ক্রীড়ামন্ত্রীর আশ্বাস তাঁর পক্ষে যতটা সাহায্য করা সম্ভব তিনি করবেন।