Asianet News BanglaAsianet News Bangla

শৃঙ্গ জয়ের অন্য নাম জুনকো তাবেই, নারী হিসেবে প্রথম পা রাখেন এভারেস্টে

  • সাত ভাইবোনের সংসারে অভাবের ছাপ সর্বত্র
  • কিন্তু পাহাড় যে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে
  • বরফে ঢাকা সাদা পাহাড়
  • সামান্য টাকা জোগাড় করতে পারলেই ছুটে যান পাহাড়ে
Junko Tabei first Japanese mountaineer set foot on Everest as a woman TMB
Author
Kolkata, First Published Sep 24, 2020, 9:33 AM IST

অল্প বয়সে সে পাহাড়কে ভালবেসে ফেলে। আর পাহাড়-পর্বত নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ক্লাইম্বিংয়ে আগ্রহ থাকলেও, পরিবারের পক্ষে তার এই অভিজাত শখ পূরণের সামর্থ ছিল না। এমনিতেই সাত ভাইবোনের সংসারে অভাবের ছাপ সর্বত্র। খাবার জোটে তবে অতিকষ্টে। সবাই তাকে বোঝান, পাহাড় চড়া বড়লোকদের খেলা। অত পয়সা তাদের কই! বাড়ির লোকেরা বলেন, হয় পড়াশুনা কর, না হয় হাতের কাজে মন দাও। কিন্তু পাহাড় যে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। রোগা-পাতলা মেয়েটা আস্তে আস্তে যেন পালটে যায়। যত বড় হয় জেদি হয়ে ওঠে সে। একদিন ঠিক করে ফেলে পাহাড়ে সে যাবেই। বরফে ঢাকা সাদা পাহাড়। তার ওপর উঠে তাকিয়ে দেখবে পৃথিবীটাকে।
স্কুল শেষ করে শোয়া ওমেনস ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক হন তিনি। সামান্য টাকা জোগাড় করতে পারলেই ছুটে যান পাহাড়ে। জাপানের কয়েকটি শৃঙ্গও আরোহণ করে ফেলেন কেবলমাত্র স্কি-পোল নিয়ে। সে যুগে বিভিন্ন দেশের পুরুষরাই সাধারণত পর্বতারোহণে আসতেন। সেখানে পাহাড়ে এক গরিব মেয়ের পাহাড়ে চড়ার দাপট তাই মেনে নিতে পারেনি জাপানের ধনী পুরুষ পর্বতারোহীরা। পদে পদে হেনস্থা হতে হয়েছে তাকে।

Junko Tabei first Japanese mountaineer set foot on Everest as a woman TMB
তাঁর ইউনিভাসিটিতে ছেলে শিক্ষার্থীদের একটা গ্রুপ ছিল। সেখানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তার, কিন্তু দেননি। ১০৬৯ সালে গ্র্যাজুয়েশনের পরে তিনি লেডিস ক্লাইবিং ক্লাব: জাপান (এলএলসি) প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানটির স্লোগান ছিল- চলো নিজেরাই একটা বিদেশী অভিযানে যাই। ওই ক্লাবটা তৈরি করার পিছনের কারণ তার প্রতি পুরুষ পর্বতারোহীদের আচরণ। 
এলএলসি’র অভিযানের জন্য দলের স্পন্সর খোঁজার দায়িত্ব পড়েছিল তাঁর ওপর। অনেক চেষ্টা করেও পাচ্ছিলেন না। তাকে তখন প্রতিনিয়ত শুনতে হয়েছে, এসব না করে মেয়েদের উচিত সন্তান পালন করা। টাকা বাঁচাতে তারা রিসাইকেল গাড়ির সিট ব্যবহার করতেন ছোট ছোট ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ বানাতে। চায়না থেকে রাজহাঁসের পালক কিনেছিলেন, সেটা নিজেদের স্লিপিং ব্যাগ বানিয়েছিলেন তারা।
ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন জুনকো তাবেই। তিনি জানান, যখন তাঁর সন্তানের বয়স তিন বছর, ওই সময়ে জাপানের মেয়েদের ঘরের বাইরে যাওয়া বারণ ছিল। তারা ঘরে রান্না করবে আর স্বামী ও পরিবারের লোকেদের চা এগিয়ে দেবে। এই তাদের কাজ। ভিনদেশের পাহাড়চূড়ায় উঠতে যাব শুনে ফুকুশিমা উপত্যকায় তাই ঢি ঢি পড়ে গেল। সমস্যা হল পাড়া-প্রতিবেশীদের না হয় সামলানো গেল, কিন্তু এত ছোট্ট বাচ্চা রেখে কীভাবে পাহাড়ে যাবে?  সাহস জোগালেন স্বামী মাসানুভো তাবেই। তিনি নিজেও পাহাড়ে উঠতে পছন্দ করতেন। সেই স্বামীর ভরসায় বোনের কাছে বাচ্চাকে রেখে রওনা হয়েছিলেন এভারেস্ট প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে।


এভারেস্ট অভিযানের জন্য তিল তিল করে তৈরি হন জুনকো। কিন্তু তখনও জোগাড় হয়নি  স্লিপিং ব্যাগ, ওয়াটারপ্রুফ গ্লাভস, ট্রাউজার আর ব্যাকপ্যাক। চিন থেকে সস্তায় হাঁসের পালক কিনে নিজেই সেলাই করে তৈরি করে নিলেন স্লিপিংব্যাগ। পুরনো পর্দার কাপড় কেটে তৈরি করলেন ট্রাউজার।
কিন্তু তাতেও সব সমস্যার সমাধান হল না। নতুন সমস্যা গ্লাভস আর ব্যাকপ্যাক নিয়ে। সেগুলো কেনার টাকাও নেই হাতে। কিন্তু হাল ছাড়ার মানুষ নন জুনকো। প্রতিবেশীর বাতিল গাড়ির সিট-কভারের রেক্সিন দিয়ে তৈরি করে নিলেন জলনিরোধক ব্যাগ আর দস্তানা। হাতের কাজের শিক্ষা এতদিনে কাজে এল। এভারেস্টের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় এই নিয়ে যুদ্ধে নামবেন জুনকো। যা আজকের যুগে অকল্পনীয়।

Junko Tabei first Japanese mountaineer set foot on Everest as a woman TMB
দীর্ঘ ট্রেনিংয়ের পর, ১৯৭৫ সালে কাঠমান্ডু দিয়ে দলটি তাদের অভিযান শুরু করে। তাবেই ছিলেন দলের ডেপুটি লিডার। ১৯৫৩ সালে স্যার অ্যাডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নরগে যেপথে এভারেস্টে ওঠেন তারা সেই পথই অনুসরণ করেন। মে মাসের শুরুর দিকে তারা যখন মাটি থেকে ৬,৩০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প করেন, একটা বরফ ধ্বস তাদের ক্যাম্প তছনছ করে দেয়। দলের গাইড এবং মেয়েরা বরফের নিচে চাপা পড়েন।
তাবেই ঠিক ৬ মিনিটের জন্যে অজ্ঞান ছিলেন, ততক্ষণে তার শেরপা গাইড তাকে বরফের নিচ থেকে বের করে আনেন। বরফধ্বসের ১২ দিন পর, ১৯৭৫-এর ১৬ মে শেরপা আন শেরিং’কে সঙ্গে নিয়ে জুনকো তাবেই পৃথিবীর প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়া জয় করেন।
তখন এভারেস্টের নীচে থেকে ওপর পর্যন্ত দড়ি ফিক্সড করে রাখার ব্যাপার ছিল না। আইসফল ডক্টররা ছিলেন না অ্যালুমিনিয়ামের মই নিয়ে। স্যাটেলাইটের পাঠানো ওয়েদার রিপোর্ট ছিল না। এভারেস্টের ক্যাম্পে ক্যাম্পে এজেন্সির ফাইভ-স্টার আতিথেয়তা ছিল না। কিন্তু তা স্বত্বেও সব বাধা পেরিয়েছিলেন  জুনকো তাবেই।

Follow Us:
Download App:
  • android
  • ios