মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার খেজুরিয়া গ্রামে এক অদ্ভুত নিয়ম প্রচলিত আছে, যেখানে গাছ বা মানুষকে বিনা কারণে ছুঁলেই মোটা টাকা জরিমানা দিতে হয়।
আমরা শহরে বড় হয়ে ভাবি নিয়ম-কানুন মানেই পুলিশ, কোর্ট আর কাগজ। কিন্তু ভারতের বুকে এমন কিছু গ্রাম আছে যেখানে বহু বছর আগের নিয়ম আজও পাথরের মতো শক্ত। পঞ্চায়েতের খাতায় নয়, সেই নিয়ম চলে মানুষের বিশ্বাস আর ভয়ে। আর সেই নিয়ম ভাঙলেই পকেট থেকে বেরোবে মোটা টাকা।

এমনই এক গ্রামের নাম খেজুরিয়া। মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার এই ছোট্ট গ্রামকে স্থানীয়রা "শান্তির গ্রাম" বলে ডাকে। এখানে চুরি নেই, মারামারি নেই, পুলিশ স্টেশনও নেই। কিন্তু তার বদলে আছে কিছু অদ্ভুত কড়া নিয়ম। আর তার মধ্যে সবচেয়ে চর্চিত নিয়ম হল ছুঁয়ে দিলেই ২,৫০০ টাকা জরিমানা।
নিয়মটা কী?
খেজুরিয়া গ্রামের প্রবীণদের বানানো নিয়ম অনুযায়ী, গ্রামের মধ্যে কোনো গাছের ডাল ভাঙা, পাতা ছেঁড়া বা ফুল তোলা যাবে না। শুধু তাই নয়, বিনা কারণে কাউকে ধাক্কা দেওয়া, ঠাট্টা করে গায়ে হাত দেওয়া, এমনকি বাচ্চাদের গায়ে জোরে চিমটি কাটাও নিষেধ।
ধরা পড়লে প্রথমবার ৫০০ টাকা। দ্বিতীয়বার ১,০০০ টাকা। আর তৃতীয়বার করলে সরাসরি ২,৫০০ টাকা জরিমানা। টাকা যায় গ্রামের মন্দিরের ফান্ডে। সেই টাকা দিয়ে গ্রামের রাস্তা, স্কুল আর গাছ লাগানোর কাজ হয়।
কেন এই অদ্ভুত নিয়ম?
গ্রামের মাতব্বররা বলেন, এই নিয়ম ৩০০ বছর আগে গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা বানিয়েছিলেন। তাঁর মতে মানুষ যদি প্রকৃতি আর একে অপরকে সম্মান না করে, তাহলে গ্রামে অশান্তি আসবে। গাছ কাটলে বৃষ্টি হবে না, মানুষকে অসম্মান করলে ঝগড়া বাড়বে। তাই "ছোঁয়া" আর "গাছ" এই দুটো জিনিসকে পবিত্র করে দেওয়া হয়েছে।
আর অবাক করা ব্যাপার হল এই নিয়মের ফলও পেয়েছে গ্রাম। বহু বছরে খেজুরিয়ায় একটাও বড় মারপিট হয়নি। গ্রাম জুড়ে শত বছরের পুরনো গাছ। গ্রামে পুলিশ ডাকার প্রয়োজন পড়ে না। ছোট বাচ্চারাও জানে গাছে ঢিল মারলেই জরিমানা।
বাইরের লোকের জন্য কী নিয়ম?
পর্যটক বা বাইরের কেউ যদি না জেনে নিয়ম ভাঙে, তাহলেও ছাড় নেই। তবে প্রথমবার গ্রামের লোকেরা সাবধান করে দেন। তারপরও ভুল করলে জরিমানা দিতেই হবে। তাই গ্রামে ঢোকার মুখেই বড় বড় বোর্ডে লেখা থাকে "গাছ ও মানুষকে সম্মান করুন"।
গ্রামের যুবকরা বলেন, "আমাদের কাছে এটা অদ্ভুত লাগে না। এটা আমাদের জীবন। আমরা মোবাইল ব্যবহার করি, শহরে চাকরি করি, কিন্তু গ্রামের নিয়ম মানতেই হবে।"
২টো কথা মাথায় রাখবেন:
এক, এই জরিমানা কোনো সরকারি আইন নয়। এটা গ্রামের নিজস্ব "সমাজের আইন"। তাই পুলিশ এখানে হস্তক্ষেপ করে না। দুই, নিয়মটা শুধু শাস্তির জন্য নয়। মানুষকে শেখানোর জন্য। প্রকৃতি আর মানুষ, দুজনকেই বাঁচিয়ে রাখার জন্যই এই কড়াকড়ি।
খেজুরিয়া প্রমাণ করে দেয় আইন সবসময় কঠিন হতে হয় না। বিশ্বাস আর একতা থাকলে একটা ছোট গ্রামও বহু বছর ধরে শান্তিতে থাকতে পারে।
