অনেকেই মনে করেন শিশুর নাক টিপে মালিশ করলে তা টিকালো হয়, কিন্তু এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এই অবৈজ্ঞানিক অভ্যাসটি শিশুর জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে, যেমন - কার্টিলেজ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং লিপয়েড নিমোনিয়ার মতো গুরুতর সংক্রমণ। তাই বাচ্চার সুস্থতার জন্য এই ধরনের টোটকা এড়িয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়েই শিশুর যত্ন নেওয়া উচিত।

ছেলে হয়েছে। পাড়ার মাসিমা এসে বললেন, ‘নাকটা বোঁচা। রোজ সরষের তেল দিয়ে টেনে দাও। টিকালো হবে।’ আপনিও শুরু করলেন। দিনে ৩ বার নাক টিপছেন, টানছেন।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

থামুন। এক্ষুণি থামুন। আপনি রূপ নয়, বিপদ ডাকছেন।

১. নাক টিপলে টিকালো হয়? মেডিকেল সায়েন্স কী বলে? এককথায় উত্তর: না। ১০০% ভুল ধারণা।

নবজাতকের নাকের ব্রিজ তৈরি হয় নরম কার্টিলেজ আর হাড় দিয়ে। জন্মের সময় এই হাড় পুরো জোড়ে না। ১৮-২৪ মাস অবধি নরম থাকে। কিন্তু তার মানে এই নয় টিপে শেপ পাল্টানো যাবে।

নাকের শেপ ১০০% জেনেটিক। বাবা-মায়ের DNA-তে যেমন লেখা, তেমনই হবে। বয়সের সঙ্গে মুখের গড়ন বদলায়, নাকও শার্প লাগে। মালিশের কোনও ভূমিকা নেই।

পেডিয়াট্রিক সার্জনরা বলছেন, ‘নাক টেপা আর কান টেনে লম্বা করা একই রকম অবৈজ্ঞানিক।’

২. মালিশে কী কী ভয়ঙ্কর বিপদ হতে পারে?

কার্টিলেজ ড্যামেজ: নবজাতকের নাকের কার্টিলেজ কাঁচের মতো ঠুনকো। জোরে চাপ পড়লে ‘ডিভিয়েটেড নেজাল সেপ্টাম’ হতে পারে। মানে নাকের মাঝের পর্দা বেঁকে যাবে। ফল – সারাজীবন নাক বন্ধ, নাক ডাকা, সাইনাস।

শ্বাসকষ্ট: নাক টিপলে বা তেল ঢুকলে ন্যাজাল প্যাসেজ ব্লক হয়। বাচ্চারা মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে পারে না। ৬ মাস অবধি ‘অবলিগেটরি নেজাল ব্রিদার’। নাক বন্ধ মানেই শ্বাসকষ্ট, নীল হয়ে যাওয়া, SIDS-এর রিস্ক।

ইনফেকশন ও নিমোনিয়া: সরষের তেল, ঘি নাকে দিলে ‘লিপয়েড নিমোনিয়া’ হয়। তেল ফুসফুসে চলে যায়। X-Ray-তে ধরা পড়ে না, অথচ বাচ্চা ধুঁকতে থাকে। অনেক কেস ICU-তে যায়।

হাড়ে চিড়: বেশি জোরে টানলে ‘নেজাল বোন ফ্র্যাকচার’ হতে পারে। বাচ্চা বলতে পারবে না, শুধু কাঁদবে। পরে নাক বাঁকা হয়ে যাবে।

স্কিন ড্যামেজ: রোজ ঘষলে নাকের পাতলা চামড়া ছড়ে যায়, র‍্যাশ হয়, ব্যাকটেরিয়া ঢোকে।

NRS হাসপাতালের শিশু বিভাগ জানাচ্ছে, মাসে ৪-৫টা কেস আসে শুধু নাক মালিশের জন্য শ্বাসকষ্ট নিয়ে।

৩. তাহলে দিদিমারা যে করত? আগে ইনফ্যান্ট মর্টালিটি বেশি ছিল। কেন বাচ্চা মরল কেউ জানত না। ‘নজর লেগেছে’ বলে চালিয়ে দিত। এখন মেডিকেল সায়েন্স বলছে, অনেক মৃত্যুই হত লিপয়েড নিমোনিয়া বা শ্বাসরোধ হয়ে – এই সব টোটকার জন্য।

৪. নাক নিয়ে কী করবেন, কী করবেন না?

করবেন না: ১. নাক টেপা, টানা, চিমটি কাটা – একদম না। ২. সরষের তেল, ঘি, মধু, কাজল নাকে দেওয়া – স্ট্রিক্টলি না। ৩. নাকের ফুটোয় কিছু ঢুকিয়ে পরিষ্কার করা – না। ৪. ‘নাক ঘষে ঘুম পাড়ানো’ – না।

করবেন: ১. স্নানের পর নরম তোয়ালে দিয়ে নাকের বাইরে হালকা মুছবেন। ২. সর্দি হলে ডাক্তারের পরামর্শে স্যালাইন নেজাল ড্রপ দিন। নোজ ফ্রিডা দিয়ে আলতো টানুন। ৩. নাক বোঁচা লাগলে চিন্তা নয়। ২ বছর পর ফেস কাট চেঞ্জ হলে নাক শার্প লাগবে। ৪. শ্বাসে আওয়াজ, নাক বন্ধ থাকলে তখনই পেডিয়াট্রিশিয়ান দেখান।

৫. কখন ডাক্তার দেখাবেন? রেড সিগন্যাল: ১. নাক টেপার পর বাচ্চা খেতে না চাইলে। ২. শ্বাস নিতে কষ্ট, বুকের খাঁচা দেবে গেলে। ৩. নাক দিয়ে রক্ত বা পুঁজ এলে। ৪. জ্বর ১০০+ আর কাশি। ৫. নাক অস্বাভাবিক বাঁকা লাগলে।

শেষ কথা: বাচ্চা সুস্থ থাকাটাই আসল সৌন্দর্য। টিকালো নাকের চেয়ে ‘ঠিকঠাক শ্বাস নেওয়া নাক’ জরুরি।

পরের বার কেউ নাক টিপতে বললে সোজা বলুন, ‘ডাক্তার বারণ করেছে’। দিদিমার আমল আর নেই। এখন আমল বিজ্ঞানের।

শখ করে বাচ্চার ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না। নাক ওরকমই থাক। ওটাই ওর আইডেন্টিটি।