দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রান্না করার ফলে বহু মহিলাই কোমর ও হাঁটুর ব্যথায় ভোগেন। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে রান্নাঘর ভাঙার প্রয়োজন নেই, বরং ৫টি সহজ কৌশল যেমন অ্যান্টি-ফ্যাটিগ ম্যাট ব্যবহার, স্ল্যাবের উচ্চতা ঠিক করা, ও সঠিক জুতো পরা আপনার রান্নাঘরকে ‘পেইন-ফ্রি’ করে তুলতে পারে। এই ছোট পরিবর্তনগুলি আপনাকে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থেকে মুক্তি দেবে।

রান্না করতে ভালো লাগে, কিন্তু ১ ঘণ্টা দাঁড়ালেই কোমর আর কোমর থাকে না।” – এই ডায়লগ ঘরে ঘরে। বিশেষ করে ৩০ পেরনো মহিলাদের।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

ফিজিওথেরাপিস্ট ডা. অনিন্দিতা সেন বলছেন, “আমার কাছে যত মহিলা কোমর-হাঁটু ব্যথা নিয়ে আসেন, ৬০% হাউসওয়াইফ। কারণ একটাই – ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভুল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রান্না। স্ল্যাবের হাইট ঠিক নেই, পায়ের নিচে শক্ত টাইলস, একটানা দাঁড়িয়ে থাকা – স্পাইন, নী, অ্যানকেলের বারোটা বাজে।”

কিন্তু রান্না তো ছাড়া যাবে না। তাহলে উপায়? হেঁশেল ভাঙতে হবে না, ৫টা ছোট কৌশলেই কিচেন হবে ‘পেইন ফ্রি জোন’।

১. পায়ের নিচে ‘অ্যান্টি ফ্যাটিগ ম্যাট’ – কোমরের বেস্ট ফ্রেন্ড সমস্যা: রান্নাঘরের টাইলস বা মার্বেল শক্ত। ১ ঘণ্টা দাঁড়ালে পায়ের তলা, গোড়ালি, হাঁটু, কোমর – সব জায়গায় প্রেশার পড়ে। রক্ত চলাচল কমে, ব্যথা শুরু।

সমাধান: সিঙ্ক আর গ্যাসের সামনে একটা ‘অ্যান্টি ফ্যাটিগ কিচেন ম্যাট’ পাতুন। এটা নরম রাবার বা ফোমের হয়, ১-২ সেমি মোটা। জুতোর শক অ্যাবজর্বারের মতো কাজ করে। ৭০% প্রেশার কমিয়ে দেয়।

দাম ও কোথায় পাবেন: অ্যামাজন, ফ্লিপকার্টে ৫০০-১,২০০ টাকা। ৩x২ ফুট সাইজ নিন। বাটা-খাদিমের কিচেন ম্যাটও চলবে।

টিপস: ৩০ মিনিট পর ম্যাটের উপর পা-এর ভর বদলান। এক পা একটু উঁচু টুলে রাখুন ৫ মিনিট।

২. স্ল্যাবের হাইট ঠিক করুন – ৯০ ডিগ্রি রুল সমস্যা: বেশিরভাগ বাড়িতে কিচেন স্ল্যাব ৩০-৩২ ইঞ্চি। ৫’২”-এর নিচে মহিলাদের জন্য ঠিক আছে। কিন্তু আপনি ৫’৪” বা লম্বা হলে? কুঁজো হয়ে কাজ করতে হয়। স্পাইনে চাপ, কোমর শেষ।

সমাধান: ‘এরগোনমিক্স রুল’ বলছে, দাঁড়িয়ে কনুই ভাঁজ করলে স্ল্যাব আপনার কনুই থেকে ১০-১৫ সেমি নিচে থাকবে। মানে কনুই ৯০ ডিগ্রি থাকবে।

কী করবেন: স্ল্যাব ভাঙা সম্ভব না হলে, মোটা কাঠের চপিং বোর্ড ইউজ করুন। ২-৩ ইঞ্চি হাইট বাড়বে। বা উঁচু প্ল্যাটফর্মে গ্যাস বসান। অনলাইনে ‘গ্যাস স্টোভ স্ট্যান্ড’ পাওয়া যায় ৮০০ টাকায়।

মাপ: আপনার হাইট ৫’০”-৫’৩” = স্ল্যাব ৩২ ইঞ্চি। ৫’৪”-৫’৭” = ৩৪-৩৬ ইঞ্চি। ৫’৮”+ = ৩৮ ইঞ্চি।

৩. ‘সিট-স্ট্যান্ড’ রুটিন – টানা ২০ মিনিটের বেশি নয় সমস্যা: আমরা একবার দাঁড়ালে ১ ঘণ্টা একটানা দাঁড়িয়ে থাকি। পেশি টাইট হয়ে যায়, ডিস্কে চাপ পড়ে।

সমাধান: ২০-৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে কাজ করুন, ৫ মিনিট বসুন। হেঁশেলে একটা উঁচু টুল বা ‘কিচেন স্টুল’ রাখুন। পেঁয়াজ কাটা, সবজি বাছা, আটা মাখা – বসে করুন।

টিপস: ‘বার স্টুল’ টাইপ টুল কিনুন, ২৪-২৬ ইঞ্চি হাইট। দাঁড়ানো-বসার মাঝামাঝি। স্ল্যাবে কাজ করতে কুঁজো হতে হবে না। ১,৫০০ টাকা থেকে শুরু।

কুইক স্ট্রেচ: বসার সময় কোমর পিছনে ঠেলুন ৫ বার। ঘাড় ডানে-বামে ঘোরান।

৪. জিনিস হাতের কাছে রাখুন – ‘কিচেন ট্রায়াঙ্গল’ মানুন সমস্যা: ফ্রিজ এক কোণে, স্ল্যাব আরেক কোণে, মশলা তাকে। বারবার ঘোরা, ঝোঁকা, টানাটানি – কোমরে মোচড় লাগে।

সমাধান: ‘কিচেন ওয়ার্ক ট্রায়াঙ্গল’ ফলো করুন। সিঙ্ক, গ্যাস, ফ্রিজ – এই তিনটে পয়েন্ট যেন একটা ট্রায়াঙ্গল তৈরি করে। তিন বাহুর মোট দৈর্ঘ্য ৪-৮ মিটারের মধ্যে।

ছোট হেঁশেলে কী করবেন: রোজকার মশলা, তেল, খুন্তি গ্যাসের পাশে ট্রেতে রাখুন। চাল-ডালের কৌটো স্ল্যাবের নিচে টানা ড্রয়ারে। ঝুঁকে তুলতে হবে না। ভারী কড়াই নিচের তাকে নয়, কোমরের লেভেলে রাখুন।

রুল: কাঁধের উপর বা হাঁটুর নিচ থেকে ভারী জিনিস তুলবেন না।

৫. জুতো পরে রান্না করুন – খালি পায়ে না সমস্যা: আমরা খালি পায়ে রান্না করি। শক্ত মেঝে সরাসরি হিল, নী, স্পাইনে ধাক্কা দেয়। ‘প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস’ – গোড়ালি ব্যথার বড় কারণ।

সমাধান: রান্নাঘরের জন্য আলাদা নরম সোলের ‘কিচেন স্লিপার’ রাখুন। মেমরি ফোম বা ডক্টর সোলের স্যান্ডেল বেস্ট। ৫০০-১,০০০ টাকা।

ডা. সেনের টিপস: “স্লিপারে আর্চ সাপোর্ট থাকতে হবে। হাওয়াই চটি নয়। রান্নার সময় কেডস পরলে আরও ভালো। লজ্জা পাবেন না, আমেরিকায় শেফরা বুট পরে রান্না করে।”

বোনাস টিপস – ২ মিনিটের কিচেন ব্যায়াম: ১. কাফ রেইজ: গ্যাসে চা বসিয়ে, সিঙ্ক ধরে গোড়ালি তুলুন-নামান ১০ বার। পায়ে রক্ত চলাচল হবে। ২. ব্যাক এক্সটেনশন: কোমরে হাত দিয়ে পিছনে হালকা বেঁকুন ৫ বার। স্পাইন রিল্যাক্স হবে। ৩. মার্চিং: দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক জায়গায় ৩০ সেকেন্ড মার্চ করুন। হাঁটু জ্যাম হবে না।

কখন ডাক্তার দেখাবেন? এই ৫টা নিয়ম মানার পরেও যদি ২ সপ্তাহ কোমর-হাঁটু ব্যথা থাকে, পায়ে ঝিঁঝি ধরে, বা ব্যথা পা বেয়ে নামে – ফিজিওথেরাপিস্ট দেখান। স্লিপ ডিস্ক বা আর্থ্রাইটিস হতে পারে।

মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ অমৃত, কিন্তু সেই হাতেই ব্যথা থাকলে? হেঁশেল শুধু পেট ভরানোর জায়গা নয়, বাড়ির ‘হার্ট’। সেই হার্ট ভালো রাখতে মায়ের কোমর-হাঁটুও ভালো রাখতে হবে। ১,০০০ টাকার ম্যাট, ১,৫০০ টাকার টুল – এই ইনভেস্টমেন্ট আপনাকে ১০ বছরের ব্যথা থেকে বাঁচাবে। কারণ সুস্থ মা মানেই খুশি পরিবার। আর আরামদায়ক হেঁশেল মানেই রোজ ভাল রান্না।