সিনেমায় প্রায়ই দেখা যায়, প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ শুনে বুকে হাত দিয়ে পড়ে গেলেন কেউ। এটা কি শুধুই সিনেমার নাটক? না। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, অতিরিক্ত শোক বা দুঃসংবাদে সত্যিই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এর নাম 'ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম' বা Takotsubo Cardiomyopathy। কীভাবে দুঃসংবাদে হার্ট ফেল করে, জানুন।
আমরা সবাই শুনেছি, অমুকের মৃত্যুসংবাদ শুনে তাঁর মা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। শুনে মনে হয়, এটা বোধহয় অতিরঞ্জিত। কিন্তু ডাক্তাররা বলছেন, এটা ১০০% সত্যি এবং এর পিছনে রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত কারণ।
*আসলে কী হয় শরীরে?*
যখন আপনি হঠাৎ কোনও ভয়ানক দুঃসংবাদ পান - যেমন কাছের মানুষের মৃত্যু, বড় ক্ষতি, অ্যাক্সিডেন্ট বা তীব্র ঝগড়া, তখন আপনার মস্তিষ্কে তীব্র স্ট্রেস তৈরি হয়।
এই সময় শরীরে হু-হু করে অ্যাড্রেনালিন ও নর-অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসৃত হয়। একে বলে 'স্ট্রেস হরমোনের বন্যা'।
এই অতিরিক্ত অ্যাড্রেনালিন সরাসরি হার্টের ওপর আঘাত করে:
*১. করোনারি আর্টারি সংকুচিত হয়ে যায়:* হঠাৎ করে হার্টের রক্তনালী সঙ্কুচিত হয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
*২. হার্টের মাংসপেশি অবশ হয়ে যায়:* হার্টের বাঁ দিকের নিচের অংশ (Left Ventricle) হঠাৎ করে ফুলে বেলুনের মতো হয়ে যায় এবং পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। জাপানে এই আকৃতি দেখতে মাছ ধরার টাকোৎসুবো পাত্রের মতো লাগে বলে এর নাম *Takotsubo Cardiomyopathy* বা *Broken Heart Syndrome*।
উপসর্গ একেবারে হার্ট অ্যাটাকের মতোই - তীব্র বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বমি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। ECG-তেও হার্ট অ্যাটাকের মতোই দেখায়।
*তাহলে কি এটা হার্ট অ্যাটাক?*
না, সাধারণ হার্ট অ্যাটাক আর এর মধ্যে পার্থক্য আছে। সাধারণ হার্ট অ্যাটাক হয় কোলেস্টেরল জমে রক্তনালী ব্লক হয়ে। আর ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম হয় শুধুমাত্র স্ট্রেস হরমোনের জন্য, ব্লক ছাড়াই। তাই এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসায় পুরোপুরি সেরে যায়, যদি সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায়। কিন্তু দেরি হলে মৃত্যুও হতে পারে।
*কারা বেশি ঝুঁকিতে?*
গবেষণা বলছে, ৫০ বছরের বেশি বয়সী মহিলাদের মধ্যে এই সিনড্রোম সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কারণ মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ায় হার্ট স্ট্রেস সহ্য করার ক্ষমতা কমে যায়। এছাড়া যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উদ্বেগ বা ডিপ্রেশনের সমস্যা আছে, তাদের ঝুঁকি বেশি।
*দুঃসংবাদ শুনলে কী করবেন?*
১. রোগীকে শুইয়ে দিন, পা একটু উঁচুতে রাখুন।
২. জোরে কাঁদতে বা উত্তেজিত হতে দেবেন না, শান্তভাবে কথা বলুন।
৩. বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে একদম দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে যান, গ্যাস বা টেনশন ভেবে বাড়িতে রাখবেন না।
৪. আগে থেকে হার্টের রোগী হলে তাঁর ওষুধ সঙ্গে রাখুন।
শোক, দুঃখ জীবনের অংশ। কিন্তু সেই শোক যেন আরেকটি প্রাণ কেড়ে না নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। তাই দুঃসংবাদ দেওয়ার সময়ও ধীরে ধীরে, শান্তভাবে, পরিবারের সকলে মিলে দিন। একা কাউকে হঠাৎ করে বড় আঘাত দেবেন না।






