লাক্ষাদ্বীপের এক স্বল্প পরিচিত দ্বীপ হল থিন্নাকারা, যা 'কোকোনাট আইল্যান্ড' নামেও পরিচিত। এখানে বিলাসবহুল হোটেলের বদলে ইকো-টেন্টে থাকার ব্যবস্থা এবং ফিরোজা রঙের স্বচ্ছ জলে স্নরকেলিং ও কায়াকিংয়ের সুযোগ রয়েছে।
গরমের ছুটিতে গোয়া-দীঘা-পুরীতে পা ফেলার জায়গা থাকে না। আর মলদ্বীপ গেলে ১ লাখের ধাক্কা। অথচ আরব সাগরের বুকে লুকিয়ে আছে ৩৬টা দ্বীপের এক স্বর্গরাজ্য—লাক্ষাদ্বীপ। তার মধ্যে সবচেয়ে আন্ডাররেটেড হল থিন্নাকারা। লোকালরা আদর করে ডাকে ‘কোকোনাট আইল্যান্ড’। কারণ এখানে মানুষের চেয়ে নারকেল গাছ বেশি। কোনও পার্মানেন্ট হোটেল নেই, শুধু ইকো-টেন্ট। রাতে জেনারেটর বন্ধ, চাঁদের আলোয় জ্বলে বিচ। এটাই আসল আইল্যান্ড ফিল।

থিন্নাকারা যাওয়া মানে টাইম মেশিনে ২০ বছর পিছিয়ে যাওয়া। এখানে নেটওয়ার্ক ধরলে লাকি। ATM নেই, শপিং মল নেই, গাড়ির হর্ন নেই। আছে শুধু ৪৫ মিনিটে হেঁটে ফেলা যায় এমন একটা দ্বীপ, আর চারপাশে ফিরোজা লেগুন। জলের রং এতটাই স্বচ্ছ যে বোট থেকে নিচের কোরাল, রঙিন মাছ সব দেখা যায়। মনে হবে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ভিতরে ঢুকে পড়েছেন।
কীভাবে যাবেন? প্রথমে কোচি। কোচি থেকে দুভাবে লাক্ষাদ্বীপ যাওয়া যায়। এক, শিপ। ১৪-২০ ঘণ্টা লাগে, ভাড়া ২০০০-৫০০০ টাকা ক্লাস অনুযায়ী। সি-সিকনেস না থাকলে এটাই বেস্ট, কারণ শিপেই খাওয়া-থাকা ইনক্লুড। দুই, ফ্লাইট। কোচি থেকে আগাত্তি আইল্যান্ড ১.৫ ঘণ্টা, ভাড়া ৫০০০-৭০০০ টাকা ওয়ানওয়ে। আগাত্তি থেকে থিন্নাকারা স্পিডবোটে ৩০ মিনিট। বোট ভাড়া শেয়ারে ৫০০ টাকা মতো।
কিন্তু লাক্ষাদ্বীপ যেতে পারমিট লাগবে। কারণ এটা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও সেনসিটিভ জোন। পারমিট পাবেন অনলাইনে http://epermit.utl.gov.in থেকে, বা SPORTS-এর অফিস থেকে। SPORTS হল লাক্ষাদ্বীপ ট্যুরিজমের সরকারি সংস্থা। ওদের ‘সমুদ্রম প্যাকেজ’ নিলে পারমিট, থাকা, খাওয়া, শিপ—সব ইনক্লুড। ৩ রাত ৪ দিনের প্যাকেজ ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু। নিজে করলে আরও কম। পারমিট ফি মাত্র ৫০ টাকা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ৩০০ টাকা। ১৫ দিন আগে অ্যাপ্লাই করুন।
থাকবেন কোথায়? থিন্নাকারায় একটাই অপশন—SPORTS-এর ইকো-টেন্ট রিসর্ট। বাঁশ-খড়ের টেন্ট, ভিতরে খাট, ফ্যান, অ্যাটাচড বাথরুম। এসি নেই, দরকারও নেই। সারাদিন নারকেল গাছের ছায়া আর রাতে সমুদ্রের হাওয়া। টেন্টের দরজা খুললেই বিচ। ভাড়া ১৫০০ টাকা পার নাইট পার হেড, সাথে ৩ বেলা খাওয়া ইনক্লুড। খাবার বলতে ফ্রেশ ধরা টুনা ফিশ ফ্রাই, লাক্ষাদ্বীপ স্পেশাল রাইস, নারকেলের চাটনি। নিরামিষ অপশনও আছে।
কী করবেন ওখানে? প্রথম দিন শুধু বিচে শুয়ে থাকুন। জলের রং দেখুন। বই পড়ুন। ফোন সাইলেন্ট করুন। দ্বিতীয় দিন স্নরকেলিং মাস্ট। গাইড নিয়ে লেগুনে নামুন। ৫ ফুট নিচেই জ্যান্ত কোরাল গার্ডেন। নিমো ফিশ, ব্লু স্টারফিশ, সি-কিউকাম্বার—সব হাতের নাগালে। সাঁতার না জানলেও লাইফ জ্যাকেট দেবে। ৩০০ টাকা লাগে। বিকেলে কায়াক নিয়ে নিজেই ঘুরুন আইল্যান্ডের চারপাশ। সূর্যাস্তের সময় আকাশ-জল দুটোই কমলা হয়ে যায়। রাতে বিচে বনফায়ার হয়। টেন্টের লোকজন মিলে গান, গল্প। লাইট পলিউশন নেই, তাই আকাশে মিল্কি ওয়ে দেখা যায় খালি চোখে।
এক্সট্রা অ্যাডভেঞ্চার চাইলে আগাত্তি থেকে স্কুবা ডাইভিং করুন ৩৫০০ টাকায়। অথবা বঙ্গারাম আইল্যান্ডে ডে-ট্রিপ নিন। বঙ্গারামকে বলে ‘আনইনহ্যাবিটেড প্যারাডাইস’। সেখানে একটাই রিসর্ট, প্রাইভেট বিচ ফিল পাবেন। থিন্নাকারা থেকে বঙ্গারাম বোটে ১০ মিনিট।
খরচ কত? বাজেট ট্রিপ প্ল্যান: কোচি-আগাত্তি শিপ আপডাউন ৪০০০ টাকা। পারমিট ৩৫০ টাকা। থিন্নাকারা টেন্ট ২ রাত ৩০০০ টাকা উইথ ফুড। বোট, স্নরকেলিং, কায়াক ১০০০ টাকা। টোটাল ৮৫০০ টাকা। ৪ জনের গ্রুপ গেলে পার হেড ৩০০০ টাকায় হয়ে যাবে। মলদ্বীপে এক রাতের রিসর্ট ভাড়া এখানে ৩ দিনের ফুল ট্রিপ।
কবে যাবেন? অক্টোবর থেকে মে বেস্ট সিজন। জুন-সেপ্টেম্বর বর্ষা, শিপ বন্ধ থাকে, সমুদ্র উত্তাল। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ভিড় একটু বেশি, আগে বুকিং করুন। কী নেবেন? হালকা কটন জামা, সানস্ক্রিন, হ্যাট, পাওয়ার ব্যাঙ্ক, ক্যাশ। কার্ড চলবে না, UPI-ও না। আইডি কার্ড আর পারমিটের ৫টা জেরক্স মাস্ট।
শেষ কথা, থিন্নাকারা তাদের জন্য না যারা ৫-স্টার চায়। এটা তাদের জন্য যারা ৫ বিলিয়ন স্টার দেখতে চায়। ফিরোজা জল, পায়ের নিচে সাদা বালি, মাথার উপর নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ—এই কম্বো ভারতে আর কোথাও পাবেন না। মলদ্বীপ পরে হবে, আগে নিজের দেশের ‘কোকোনাট আইল্যান্ড’ দেখে আসুন।
লাক্ষাদ্বীপ ইকোলজিক্যালি সেনসিটিভ এলাকা। প্লাস্টিক ব্যানড। কোরাল বা শেল তোলা আইনত দণ্ডনীয়। পারমিট ছাড়া ঢোকা যায় না। আবহাওয়া খারাপ হলে শিপ/ফ্লাইট ক্যানসেল হতে পারে। যাওয়ার আগে SPORTS-এর ওয়েবসাইটে আপডেট দেখে নিন।


