পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ও বিরল চায়ের মধ্যে একটি হল ‘মুনলাইট টি’। ভারতে এই চা শুধু দার্জিলিং-এই হয়। প্রতি বছর বৈশাখের পূর্ণিমার রাতে নির্দিষ্ট কিছু বাগানে চাঁদের আলোয় হাতে তোলা হয় দুটি পাতা একটি কুঁড়ি।

চা মানেই দার্জিলিং। আর দার্জিলিং মানেই ‘চ্যাম্পেন অফ টি’। কিন্তু তার মধ্যেও একটা চা আছে যাকে চা-সমঝদাররা বলেন ‘রাজা’। নাম ‘মুনলাইট টি’ বা চাঁদের আলোয় তোলা চা। আর এই বিরল চা পৃথিবীতে তৈরি হয় শুধুমাত্র ভারতের দার্জিলিং-এর কয়েকটি হেরিটেজ বাগানে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

পূর্ণিমার রাতের রিচুয়াল: প্রতি বছর বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা। ক্যালেন্ডার দেখে দিন ঠিক করে রাখেন বাগান মালিকরা। ঘড়িতে রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টে— এই ৪ ঘণ্টাই ‘গোল্ডেন আওয়ার’।

রাত ১টা বাজতেই মাকাইবাড়ি, মার্গারেটস হোপ, গোপালধারা, জুংপানা— এই বাগানগুলোতে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। টর্চ, মোবাইলের আলো, কথা বলা সব নিষেধ। শুধু জ্যোৎস্না। সেই মায়াবী আলোয় বাগানের অভিজ্ঞ মহিলা শ্রমিকরা সাদা শাড়ি ও ঝুড়ি হাতে লাইনে দাঁড়ান। নিয়ম একটাই— ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে ছিঁড়ে ঝুড়িতে রাখতে হবে। পাতা যেন না থেঁতলে যায়।

বিজ্ঞান কী বলছে? চা-গবেষকদের মতে, পূর্ণিমার রাতে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে গাছের মধ্যে ‘স্যাপ ফ্লো’ সবচেয়ে বেশি হয়। গাছের ডগায় রস ও অ্যামাইনো অ্যাসিড জমে। দিনের কড়া রোদে যে ট্যানিন ও ক্যাফিন বেড়ে গিয়ে তিক্ততা আনে, রাতের ঠান্ডায় তা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তার উপর রাতের শিশির পাতাকে করে তোলে আরও কচি, রসালো ও সুগন্ধি।

টকিও ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, মুনলাইটে তোলা চা-পাতায় L-Theanine এর পরিমাণ ৩০% বেশি থাকে। যার ফলে স্বাদ হয় মিষ্টি ও উমামি।

ফ্যাক্টরি থেকে কাপ পর্যন্ত: রাত ৪টের মধ্যে তোলা পাতা সোজা ফ্যাক্টরিতে। সেখানেও কোনও বৈদ্যুতিক মেশিন নয়। সব কাজ হাতে। উইদারিং, রোলিং, অক্সিডেশন— সবই হয় ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই। মালিকদের বিশ্বাস, সূর্যের আলো পড়লেই পাতার ‘চাঁদের এনার্জি’ নষ্ট হয়ে যাবে।

ফলাফল? এক কাপ চা। লিকার হবে হালকা সোনালি। গন্ধে ভাসবে জুঁই, লিচু আর পাকা আমের মিশেল। জিভে কোনও কষ নেই, আছে মধুর মতো মিষ্টি আফটারটেস্ট।

কেন এত দাম? এই কারণেই ‘মুনলাইট টি’ বিশ্বের সবচেয়ে দামি চায়ের একটি। প্রতি বছর গোটা দার্জিলিং-এ ৩০ থেকে ৫০ কেজির বেশি এই চা তৈরি হয় না। জাপানের গিনজা, লন্ডনের ফোর্টনাম অ্যান্ড মেসন, নিউইয়র্কের নিলামে ১০ গ্রাম চায়ের দাম ওঠে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালে মাকাইবাড়ির ২৫ গ্রামের একটা প্যাকেট ৪৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

চা-বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় কাপুর বলেন, “এটা শুধু পানীয় নয়। এটা দার্জিলিং-এর পূর্ণিমার রাত, মাটির গন্ধ আর মানুষের বিশ্বাসকে বোতলে ভরে রাখা।”

পর্যটন ও ভবিষ্যৎ এবার এই ‘মুনলাইট টি’ কে ব্র্যান্ড করতে চাইছে রাজ্য পর্যটন দপ্তর। প্ল্যান আছে, নির্দিষ্ট ফি দিয়ে পর্যটকরা পূর্ণিমার রাতে বাগানে গিয়ে চা তোলা দেখতে পারবেন। সাথে থাকবে ‘মুনলাইট টি টেস্টিং সেশন’।

দার্জিলিং টি অ্যাসোসিয়েশনের সচিব বলেন, “GI ট্যাগের পর দার্জিলিং চায়ের কদর বেড়েছে। মুনলাইট টি সেই ব্র্যান্ড ভ্যালু আরও ১০ গুণ বাড়িয়ে দেবে।”

চাঁদ, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর চা-পাতা— তিনে মিলে যে জাদু তৈরি হয়, তা সত্যিই শুধু দার্জিলিং-এই সম্ভব। এক কাপে ধরা থাকে হাজার বছরের পাহাড়ি ঐতিহ্য।