৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সে গর্ভধারণকে 'অ্যাডভান্সড ম্যাটারনাল এজ' বলা হয়, যা প্রেগন্যান্সিতে মিসক্যারেজ, শিশুর জন্মগত ত্রুটি এবং মায়ের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জেনে নিন বিস্তারিত।
আজকাল অনেকেই একটু দেরিতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু যখন কোনও মহিলা ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সে মা হতে চান, তখন মেডিকেলের ভাষায় একে 'অ্যাডভান্সড ম্যাটারনাল এজ' (Advanced Maternal Age) বলা হয়। এই সময়ে প্রেগন্যান্সিতে কিছু জটিলতা আসার ঝুঁকি বেশি থাকে।

যেমন, মিসক্যারেজ বা গর্ভপাত, শিশুর জন্মগত ত্রুটি বা ক্রোমোজোমের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর পাশাপাশি মায়ের ডায়াবেটিস এবং হাই ব্লাড প্রেসারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মহিলাদের ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমতে থাকে, ফলে ফার্টিলিটির সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, ৩৫ বছরের পর প্রতি মাসে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। অন্যদিকে, মিসক্যারেজের ঝুঁকি থাকে প্রায় ২০ শতাংশ। তবে এর মানে এই নয় যে ৩৫-এর পর স্বাস্থ্যকর প্রেগন্যান্সি সম্ভব নয়। সঠিক ডাক্তারি পরামর্শ, প্রেগন্যান্সির আগে কিছু জরুরি টেস্ট এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়। এর ফলে শিশুর জন্মগত ত্রুটিও আগে থেকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং একটি সুরক্ষিত প্রেগন্যান্সির পরিকল্পনা করা যায়।
আসুন জেনে নিই, কোন বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।
১. ফার্টিলিটি এবং ওভারিয়ান রিজার্ভ
মহিলাদের ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণুর ভান্ডার কেমন আছে, তা বোঝার জন্য ওভারিয়ান রিজার্ভ টেস্ট করা হয়। এর জন্য AMH (Anti-Müllerian Hormone) এবং FSH (Follicle-Stimulating Hormone)-এর মতো হরমোন টেস্ট করা হয়। সঙ্গে আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে 'অ্যান্ট্রাল ফলিকল কাউন্ট' (AFC - Antral Follicle Count) পরীক্ষাও করা হয়। এই টেস্টগুলো প্রেগন্যান্সির সঠিক পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে।
২. থাইরয়েড এবং হরমোনের স্বাস্থ্য
থাইরয়েড হরমোনের গন্ডগোল মহিলাদের ওভিউলেশন বা ডিম্বাণু নিঃসরণে বাধা দেয়, যা প্রেগন্যান্সিতে সমস্যা তৈরি করে। এর চিকিৎসা না করালে মিসক্যারেজের ঝুঁকি বাড়ে এবং শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মা হওয়ার পরিকল্পনা করার আগে TSH, T3, T4-সহ একটি থাইরয়েড প্রোফাইল টেস্ট করানো খুব জরুরি। বিশেষ করে যাঁদের বয়স ৩০-এর বেশি, পিরিয়ড অনিয়মিত, আগে মিসক্যারেজ হয়েছে বা ওজন বেশি, তাঁদের এই টেস্ট অবশ্যই করানো উচিত।
৩. ডায়াবেটিস এবং ব্লাড প্রেসার
যাঁরা ৩৫-এর পর মা হওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের ব্লাড সুগার এবং ব্লাড প্রেসার অবশ্যই পরীক্ষা করানো উচিত। HbA1c এবং ফাস্টিং গ্লুকোজ টেস্টের মাধ্যমে ডায়াবেটিস আছে কিনা, তা ধরা পড়ে। প্রেগন্যান্সির আগে এগুলো নিয়ন্ত্রণে না আনলে, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস (gestational diabetes), উচ্চ রক্তচাপ, সময়ের আগে ডেলিভারি এবং শিশুর সঠিক বিকাশে বাধা আসতে পারে।
৪. পুষ্টির ঘাটতি জানার জন্য টেস্ট
শরীরে আয়রন এবং বিভিন্ন ভিটামিনের মাত্রা জানতে ফেরিটিন (Ferritin), হিমোগ্লোবিন, ভিটামিন ডি এবং ভিটামিন বি১২-এর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এই সব পুষ্টির অভাবে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা হতে পারে এবং শিশুর বিকাশেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৫. রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ, ইনফেকশন এবং ইমিউনিটি টেস্ট
জরায়ুতে টিউমার (fibroids), ডিম্বাশয়ে সিস্ট (cysts) বা এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো সমস্যা আছে কিনা, তা জানতে পেলভিক পরীক্ষা এবং আলট্রাসাউন্ড খুব সাহায্য করে। এছাড়া রুবেলা, ভ্যারিসেলার মতো রোগের বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে কিনা, সেটাও দেখে নেওয়া হয়। প্রেগন্যান্সির আগে HIV, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি এবং সিফিলিসের মতো যৌনরোগ (STIs) স্ক্রিনিং করানোও অত্যন্ত জরুরি।


