ছুটি পেলেই দিঘা, পুরী, মন্দারমণি। ভিড়ে আর ভালো লাগছে না? অথচ হাতে সময় মাত্র ২ দিন। তাহলে এবার ঘুরে আসুন কলকাতার একদম কাছে লুকিয়ে থাকা ‘গ্রিন ল্যান্ড’ টাকি থেকে।
উইকেন্ডে লং ড্রাইভে যেতে চান কিন্তু ৫-৬ ঘণ্টার জার্নি করতে চান না? তাহলে আপনার ডেস্টিনেশন হোক উত্তর ২৪ পরগনার টাকি। বসিরহাট মহকুমার এই শহর ইছামতী নদীর জন্য বিখ্যাত। নদীর এপারে ভারত, ওপারে বাংলাদেশ। মাঝখানে নৌকা নিয়ে BSF-এর টহল। তার সাথে আছে ঘন গোলপাতা, হেতালের জঙ্গল, আর বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত। শহরের কোলাহল ছেড়ে ২৪ ঘণ্টা শান্তিতে কাটানোর আদর্শ জায়গা।

কেন যাবেন টাকি? কী দেখবেন?
১. ইছামতীতে নৌকাবিহার: এটাই টাকির প্রধান আকর্ষণ। ঘণ্টায় ২০০-৩০০ টাকায় মোটরবোট ভাড়া পাওয়া যায়। নৌকা আপনাকে নিয়ে যাবে জিরো পয়েন্টে। যেখানে দুই দেশের জলসীমা ভাগ হয়েছে। ওপারে বাংলাদেশের বাচ্চারা হাত নাড়বে, এপারে আপনি। সাথে দেখবেন মাছরাঙা দ্বীপ, গোলপাতা জঙ্গল। সূর্যাস্তের সময় নদীর জল সোনালি হয়ে যায়।
২. মিনি সুন্দরবন বা গোলপাতা জঙ্গল: টাকি রাজবাড়ি ঘাট থেকে টোটো নিয়ে ১০ মিনিট। এখানে সুন্দরবনের মতো গোলপাতা, হেতাল, কেওড়া গাছের জঙ্গল আছে। কাঠের সাঁকো করা আছে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। ভাগ্য ভালো থাকলে মেছো বেড়াল, বক, মদনটাক দেখতে পাবেন। এন্ট্রি ফি মাত্র ১০ টাকা।
৩. টাকি রাজবাড়ি ও জোড়া শিবমন্দির: ৩০০ বছরের পুরনো টাকি রাজবাড়ি এখন ভগ্নদশা, কিন্তু ইতিহাসের গন্ধ মাখা। পাশেই আছে ৪০০ বছরের পুরনো জোড়া শিবমন্দির। পোড়ামাটির কাজ দেখার মতো।
৪. বিসর্জনের শোভাযাত্রা: দুর্গাপুজোর দশমীতে এখানে ভারত-বাংলাদেশের দুই দেশের প্রতিমা ইছামতীতে একসাথে ভাসান হয়। সেই দৃশ্য দেখতে লাখো মানুষ ভিড় করেন।
কীভাবে যাবেন কলকাতা থেকে?
ট্রেনে: সবচেয়ে সস্তা ও আরামদায়ক। শিয়ালদহ থেকে হাসনাবাদ লোকাল ধরুন। টাকি রোড স্টেশনে নামুন। সময় লাগবে ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। ভাড়া ২৫ টাকা। স্টেশন থেকে টোটোতে ১০ মিনিটে ইছামতী নদীর ঘাট। ভাড়া ১৫ টাকা জনপ্রতি। সকাল ৭:১২, ৯:২২, ১২:১২-তে ট্রেন আছে।
গাড়িতে: সায়েন্স সিটি, বাসন্তী হাইওয়ে, মালঞ্চ, ঘোষপুর হয়ে টাকি। দূরত্ব ৭০ কিমি। সময় লাগবে ২-২.৫ ঘণ্টা। রাস্তা বেশ ভালো। পার্কিং চার্জ ৫০ টাকা দিনপ্রতি।
বাসে: ধর্মতলা থেকে বসিরহাটগামী বাসে টাকি মোড়ে নামুন। সময় লাগবে ৩ ঘণ্টা। ভাড়া ৮০ টাকা।
কোথায় থাকবেন? খরচ কত? টাকিতে এখন প্রচুর ভালো রিসোর্ট ও গেস্ট হাউস হয়েছে। নদীর ধারে থাকাই ভালো।
১. বাজেট স্টে: ইছামতী গেস্ট হাউস, সুহাসিনী গেস্ট হাউস। নন-এসি রুম ৮০০-১২০০ টাকা। এসি ১৫০০-১৮০০ টাকা। নদী দেখা যায় না, কিন্তু ২ মিনিট হাঁটাপথ।
২. মিড রেঞ্জ: সোনার বাংলা টাকি, টাকি গ্রিন ভিলা। নদীর একদম ধারে। ব্যালকনি থেকে ইছামতী ও বাংলাদেশ দেখা যায়। এসি রুম ২৫০০-৩৫০০ টাকা প্রতিদিন। খাবার-সহ প্যাকেজ ১৮০০ টাকা জনপ্রতি।
৩. লাক্সারি: টাকি ইকো ট্যুরিজম কটেজ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের। অনলাইন বুকিং হয় http://wbtourism.gov.in থেকে। এসি কটেজ ৩২০০ টাকা + GST। লোকেশন সেরা।
খাবার কী খাবেন?
ইছামতীর টাটকা পার্শে, ভেটকি, গলদা চিংড়ি মাস্ট ট্রাই। নদীর ধারের হোটেলগুলোয় ১৫০-২০০ টাকায় ভেটকি পাতুরি, পার্শে ঝাল পাবেন। সোনার বাংলার ‘নলেন গুড়ের আইসক্রিম’ ফেমাস। রাস্তার ধারে ১০ টাকায় ডাব খান।
১ দিনের ট্যুর প্ল্যান ও খরচ: সকাল ৭:১২-র ট্রেন ধরে ৯:৩০-এ টাকি। টোটো বুক করে ৪০০ টাকায় রাজবাড়ি, জোড়া মন্দির, মিনি সুন্দরবন ঘুরুন। দুপুরে লাঞ্চ ২০০ টাকা। বিকেল ৪টে নাগাদ ১ ঘণ্টা নৌকাবিহার ৩০০ টাকা। ৫:৪২-এর ট্রেন ধরে ৮টায় কলকাতা। মোট খরচ জনপ্রতি: ২৫+১৫+১০০+২০০+৭৫+২৫+১৫ = ৪৫৫ টাকা। ৫০০ টাকায় দিনের দিন ঘুরে আসা সম্ভব।
কখন যাবেন? বর্ষা বাদ দিয়ে বছরের যেকোনো সময়। তবে সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। দুর্গাপুজোর দশমীতে গেলে বিসর্জন দেখতে পাবেন, কিন্তু ভিড় মারাত্মক। শীতে পিকনিকের ভিড় থাকে। নিরিবিলি চাইলে গরমের সপ্তাহের দিনে যান।
মনে রাখবেন: ১. বর্ডার এলাকা, তাই আধার কার্ড সাথে রাখুন। BSF জিজ্ঞাসা করলে দেখাতে হবে। ২. নদীতে নামা বা সাঁতার কাটা নিষেধ। স্রোত খুব বেশি। ৩. ওপারে বাংলাদেশের ছবি তুলতে পারেন, কিন্তু BSF ক্যাম্প বা জওয়ানদের ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ৪. ক্যাশ নিয়ে যান। অনেক জায়গায় UPI চলে না।
