ভুল নিয়মে ১৫ হাজার পা হেঁটেও লাভ নেই, সঠিক নিয়মে ৫ হাজার পা-ই হার্ট, সুগার, আয়ু বাড়াতে পারে।
ফোনে স্টেপ কাউন্টার খুলেই মন খারাপ? ১০ হাজার হয়নি বলে নিজেকে আনফিট ভাবছেন? এবার টেনশন ছাড়ুন। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল আর JAMA-র নতুন স্টাডি বলছে, ‘বেশি হাঁটা’ নয়, ‘বয়স অনুযায়ী হাঁটা’টাই আসল।

কেন ১০ হাজার পা-এর নিয়ম ভুল? ১৯৬৫ সালে জাপানের Yamasa কোম্পানি ‘Manpo-kei’ নামে একটা স্টেপ কাউন্টার বের করে। জাপানি ভাষায় ‘Man’ মানে ১০ হাজার। ওই নাম থেকেই ১০ হাজার পা-এর থিওরি চালু হয়। কোনো বিজ্ঞান ছিল না, পুরোটাই মার্কেটিং।
বয়স অনুযায়ী কত পা হাঁটবেন? রিসার্চ বেসড চার্ট:
১. ২০ থেকে ৩৯ বছর: টার্গেট ৮-১২ হাজার পা এই বয়সে মেটাবলিজম ফাস্ট। চাকরি, সংসারের স্ট্রেস সামলাতে আর ভবিষ্যতের ফ্যাটি লিভার, স্পন্ডিলাইটিস আটকাতে দিনে 4 হাজার মিনিমাম। পারলে ১২ হাজার। সপ্তাহে ৩ দিন ৩০ মিনিট ‘Brisk Walk’ মাস্ট। মানে হাঁটার সময় কথা বলতে পারবেন, কিন্তু গান গাইতে পারবেন না, এমন স্পিড।
২. ৪০ থেকে ৫৯ বছর: টার্গেট ৮-১০ হাজার পা এই বয়সে সুগার, প্রেশার, কোলেস্টেরল উঁকি মারে। Harvard-এর ১৬ হাজার মহিলার উপর স্টাডি বলছে, দিনে ৪৪০০ পা হাঁটলেই মৃত্যুঝুঁকি ৪১% কমে। ৭৫০০ পা-তে গিয়ে বেনিফিট ‘পিক’ করে। তারপর ১০ হাজার পর্যন্ত লাভ বাড়ে, কিন্তু খুব ধীরে। তাই ৮-১০হাজার হল ‘সুইট স্পট’।
গুরুত্বপূর্ণ: শুধু পা গুনলে হবে না। দিনে ২০-৩০ মিনিট টানা হাঁটুন ১০০-১২০ পা/মিনিট স্পিডে। এটাকে ‘ক্যাডেন্স’ বলে। লিফট ছেড়ে সিঁড়ি, ১কিমি-র জন্য রিকশা না নেওয়া, এই ছোট ছোট হ্যাবিট যোগ করুন।
৩. ৬০ বছর ও তার বেশি: টার্গেট ৬-৮ হাজার পা ৬০ পেরোলে জয়েন্ট, ব্যালান্স, এনার্জি কমে। এই বয়সে ১০ হাজারের চাপ নিলে হাঁটু ক্ষয়ে যাবে, লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি।
JAMA-র ২০২১-এর রিপোর্ট বলছে, ৬০+ বয়সে দিনে ৬-৮ হাজার পা হাঁটলেই মৃত্যুঝুঁকি ৫০-৬০% কমে। ৪ হাজারের পর এক্সট্রা বেনিফিট প্রায় নেই। ৩৮০০ পা হাঁটলেও যারা ২০০০ পা হাঁটে তাদের চেয়ে ২৫% কম ঝুঁকি।
৬০+ বয়সের হাঁটার ৪টে গোল্ডেন রুল: ১. সময় ভাগ করুন: একটানা ১ ঘণ্টা নয়। সকালে ২০ মিনিট, বিকেলে ২০ মিনিট, রাতে খাওয়ার পর ১০ মিনিট। খাওয়ার পরের ১০ মিনিটের হাঁটা সুগার স্পাইক ৩০% কমায়। ২. স্পিড নয়, ব্যালান্স: জোরে হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেলে হিপ ফ্র্যাকচার হতে পারে। সোজা হয়ে, হাত দুলিয়ে, কমফোর্ট স্পিডে হাঁটুন। পার্কের ঘাস বা মাটিতে হাঁটুন, পিচের রাস্তা এড়িয়ে চলুন। ৩. জুতো মাস্ট: খালি পায়ে বা হাওয়াই চপ্পলে নয়। ভালো গ্রিপের ওয়াকিং শু পরুন। মোজা পরবেন। ৪. ওয়ার্ম আপ: হাঁটার আগে ২ মিনিট হাত-পা নাড়ুন, ঘাড় ঘোরান। হঠাৎ শুরু করলে মাসল ক্র্যাম্প হবে।
কখন হাঁটবেন না? ১. ভরা পেটে, খাওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে। ২. বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘুরলে। ৩. হাঁটুতে তীব্র ব্যথা বা ফোলা থাকলে। ডাক্তার দেখিয়ে জলে হাঁটুন। ৪. দুপুর ১২ টা-৩ টে গরমে। হিট স্ট্রোক হবে।
শুধু পা গুনলেই হবে? ‘ইন্টেনসিটি’টাই আসল ৭০ বছরের কেউ যদি ১ ঘণ্টায় ৩ হাজার পা হাঁটে, আর ৪০ বছরের কেউ ৩০ মিনিটে ৪ হাজার পা, তাহলে ৪০ বছরের লোকটার লাভ বেশি। কারণ তার হার্ট রেট বেড়েছে।
টেস্ট করুন: হাঁটার সময় ‘টক টেস্ট’ করুন। যদি অনায়াসে গল্প করতে পারেন, স্পিড কম। যদি কথা বলতে দম লাগে কিন্তু বলতে পারেন, পারফেক্ট ‘মডারেট ইন্টেনসিটি’। যদি কথা বলতেই না পারেন, বেশি জোরে হাঁটছেন।
শেষ কথা: স্টেপ কাউন্টার আপনার চাকর, মনিব নয়। ১০ হাজারের মাইলস্টোন ছুঁতে গিয়ে স্ট্রেস নেবেন না। বয়স, শরীর, সময় বুঝে টার্গেট সেট করুন।
আজ থেকে নিয়ম: ৪০-এর নিচে ৮ হাজার, ৪০-৬০ তে ৮ হাজার, ৬০ পেরোলে ৭ হাজার। আর সপ্তাহে ৫ দিন ৩০ মিনিট ‘টক টেস্ট’ পাস করা হাঁটা।
মনে রাখবেন, না হাঁটার চেয়ে কম হাঁটা ভালো। কম হাঁটার চেয়ে নিয়মিত হাঁটা ভালো। আজই শুরু করুন। পরিবারের সবাইকে এই নিয়মটা শেখান।
