স্কুল-কলেজ, অফিস বা পাড়ার বন্ধু - সময়ের সঙ্গে ব্যস্ততা, ইগো আর দূরত্ব বাড়লে অনেক সম্পর্কই আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায়। ছোট ভুল বোঝাবুঝি, যোগাযোগের অভাব আর হিংসার কারণে বন্ধুত্ব ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু কিছু সহজ অভ্যাস আর যত্ন মানলে বন্ধুত্ব আজীবন টিকে থাকে।

জীবনে টাকা-পয়সা আসবে যাবে, চাকরি বদলাবে, শহর বদলাবে। কিন্তু একটা সত্যিকারের বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। স্কুলের বেঞ্চে পাশে বসা বন্ধু, কলেজের নোট শেয়ার করা সঙ্গী, বা অফিসের চাপের সময় পাশে থাকা কলিগ - এরা সবাই জীবনের আলাদা অধ্যায়।

সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, ব্যস্ততা বাড়ে, বিয়ে-সংসার-বাচ্চা নিয়ে দূরত্ব তৈরি হয়। WhatsApp এ "Last Seen" দেখেও মেসেজ করা হয় না। ধীরে ধীরে সম্পর্ক ফিকে হয়ে যায়। অথচ কিছু বন্ধুত্ব ১০-১৫ বছর পরেও প্রথম দিনের মতোই থাকে। এর পেছনে কোনও ম্যাজিক নেই, আছে একটু যত্ন, একটু বোঝাপড়া আর সম্মান। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে রোজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতে হবে এমনটা নয়। ছোট ছোট ৬টি অভ্যাসই আপনার বন্ধুত্বকে লোহার মতো মজবুত করবে।

বন্ধুত্ব অটুট রাখার ৬টি অব্যর্থ উপায়:

১. যোগাযোগের সুতো ছিঁড়তে দেবেন না: "কাজের চাপে সময় পাই না" - এটা সবথেকে বড় অজুহাত। রোজ ২ঘণ্টা কথা বলতে হবে না। সপ্তাহে একবার ২মিনিটের "কেমন আছিস রে?" মেসেজই যথেষ্ট। ওর বাবা অসুস্থ হলে খবর নিন, নতুন চাকরি পেলে অভিনন্দন জানান। জন্মদিন, অ্যানিভার্সারি ক্যালেন্ডারে সেভ করে রাখুন। এই ছোট ছোট খোঁজখবরই বলে দেয় "তুই আমার কাছে ইম্পর্টেন্ট"।

২. ইগোকে দরজার বাইরে রাখুন: বন্ধুত্বে ঝগড়া হবে না তা হয় না। কিন্তু রাগ করে ১৫ দিন কথা বন্ধ রাখলে ক্ষতটা গভীর হয়। ভুল আপনার হলেও আগে "সরি" বলুন। বন্ধু ভুল করলে বোঝান, অপমান করবেন না। মনে রাখবেন ইগো দিয়ে ২ দিন সম্পর্ক টেকে, ভালোবাসা আর ক্ষমা দিয়ে ২০ বছর টেকে। কঠিন সময়ে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোই আসল বন্ধুত্ব।

৩. কোয়ালিটি টাইম বের করুন: ফোনে ২৪ ঘণ্টা অনলাইন থাকা আর সামনাসামনি আড্ডা এক নয়। মাসে একবার হলেও প্ল্যান করুন। পুরনো কলেজের ক্যান্টিনে চা, রবিবার সকালে পার্কে হাঁটা, বা শুধু ওর বাড়িতে গিয়ে ৩ ঘণ্টা গল্প। পুরনো ফটো দেখে হাসা, একসঙ্গে সিনেমা দেখা। এই শেয়ার করা মুহূর্তগুলোই বন্ধুত্বের ব্যাঙ্কে জমা হয়, যা খারাপ সময়ে কাজে লাগে।

৪. হিংসা নয়, সেলিব্রেট করুন: এটা সবথেকে কঠিন। আপনার বন্ধু যখন আপনার থেকে ভালো চাকরি পায়, বড় ফ্ল্যাট কেনে বা বিদেশ যায়, তখন মন থেকে খুশি হতে পারা। হিংসা বন্ধুত্বের ক্যান্সার। ওর সাফল্যকে নিজের সাফল্য ভাবুন। পিঠ পিছনে "ওর তো লাক ভালো" না বলে, সামনে গিয়ে "ভাই গর্ব হচ্ছে তোর জন্য" বলুন। ওর জয়ে আপনি খুশি হলে, আপনার জয়েও ও খুশি হবে।

৫. স্পেস দিন, কিন্তু হারিয়ে যেতে দেবেন না: বড় হওয়ার সঙ্গে সবারই প্রায়োরিটি বদলায়। কেউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত, কেউ ক্যারিয়ার নিয়ে। সবসময় আঁকড়ে ধরবেন না। ওকে ওর ব্যক্তিগত স্পেস দিন। কিন্তু এটাও বুঝিয়ে দিন যে প্রয়োজনে রাত ৩ টেয় ফোন করলেও আপনি "হ্যাঁ বল" বলবেন। "আমি আছি" - এই নীরব ভরসাটাই বন্ধুত্বের ফাউন্ডেশন।

৬. পুরনো স্মৃতি জিইয়ে রাখুন: বন্ধুত্বের আসল শক্তি হলো কমন মেমরি। মাঝে মাঝে পুরনো গ্রুপ ফটো শেয়ার করুন, স্কুলের গল্প করুন, একসঙ্গে তোলা ভিডিও দেখুন। "মনে আছে সেবার..." দিয়ে কথা শুরু করুন। এই নস্টালজিয়াই সম্পর্ককে টাটকা রাখে। প্রয়োজনে প্রতি বছর একবার রিইউনিয়ন প্ল্যান করুন।

কোন ভুলগুলো করবেন না:

- শুধু প্রয়োজনে বন্ধুকে মনে করা

- গ্রুপে একজনকে বাদ দিয়ে প্ল্যান করা

- বন্ধুর পার্সোনাল কথা অন্যদের বলা

- "তুই বদলে গেছিস" বলে দোষ দেওয়া

বন্ধুত্ব মানে রোজ দেখা নয়। ২ বছর পর দেখা হলেও ২ মিনিটে আগের মতো ঝগড়া আর আড্ডা শুরু হয়ে যাওয়া। সময় বদলাবে, চুলে পাক ধরবে, কিন্তু এই ৬টি নিয়ম মানলে আপনার বন্ধুত্বও বদলাবে না। কারণ দিনের শেষে টাকা নয়, একটা ফোনকল যে বলে "চল একটু আড্ডা মারি" - সেটাই জীবনের সবথেকে বড় শান্তি।