ঝগড়া, অপমান, কান্না - সবই আছে। তবুও সেই মানুষটাকে ছাড়ার কথা ভাবলেই দম বন্ধ লাগছে। মনোবিদরা বলছেন আপনি দুর্বল নন, আপনি ৫টা গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণে আটকে আছেন।

ফোন এলেই বুক ধড়ফড়। কথা শুরু হলেই ঝগড়া, অপমান, সন্দেহ। তারপর রাতভর কান্না। বন্ধুরা বলে "ওকে ব্লক কর"। মা বলে "সম্মান নেই যে সম্পর্কে"। আপনিও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলেন "এবার শেষ"।

কিন্তু পরের দিনই যখন "সরি, আর হবে না" মেসেজটা আসে, সব ভুলে যান। হাত-পা কাঁপে, বুকের ভিতর মোচড় দেয়। মনে হয় "ওকে ছাড়া আমি থাকব কী করে?"

এই আটকে থাকার নামই ট্রমা বন্ড। কলকাতার সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. অনিন্দিতা রায় বলেন, "৮০% মানুষ বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বেরোতে পারে না কারণ তারা ভালোবাসার জন্য নয়, ভয় আর অভ্যাসের জন্য থাকে।"

কারণ ১: ট্রমা বন্ড - ব্যাথা আর ভালোবাসার কেমিক্যাল নেশা মনোবিদরা বলেন এটা জুয়ার নেশার মতো। সঙ্গী আপনাকে আজ খুব কষ্ট দিল। কাল আবার কেক নিয়ে "আই লাভ ইউ" বলল। এই "ব্যাথা-তারপর-আদর" এর সময় আপনার ব্রেনে প্রচুর ডোপামিন রিলিজ হয়। ব্রেন তখন ওই "সরি" শোনার জন্যই অ্যাডিক্টেড হয়ে যায়। উদাহরণ: "সপ্তাহে ৩ দিন ঝগড়া করে ব্লক। ৪র্থ দিনে 'তোমাকে ছাড়া বাঁচব না'। এই ৪র্থ দিনটার জন্যই আপনি ৩ দিনের কষ্ট ভুলে যান।"

কারণ ২: সিঙ্ক কস্ট ফ্যালাসি - "এত বছর নষ্ট হবে"

৫ বছর, ৭ বছর। কত প্ল্যান, কত ঝগড়া করে মেটানো। মন বলে "এখন ছাড়লে সব জলে যাবে"। এটাকে বলে Sunk Cost Fallacy। আপনি ভাবছেন পিছনের ইনভেস্টমেন্ট বাঁচাতে হবে। কিন্তু সত্যিটা হল, ভবিষ্যতের আরও ৫ বছর নষ্ট করার থেকে পিছনের ৫ বছরকে শিক্ষা ভাবা অনেক ভালো। সম্পর্ক ব্যাংক নয় যে টাকা তুলতে হবে।

কারণ ৩: একা হয়ে যাওয়ার ভয় আর কনফিডেন্স জিরো

সাব-পয়েন্ট: "ও ছাড়া আমাকে কে বুঝবে" বিষাক্ত মানুষ ধীরে ধীরে আপনার কনফিডেন্স শেষ করে দেয়। রোজ বলে "তোমাকে কেউ নেবে না", "তুমি কিছু পারো না", "আমিই সহ্য করি"। একসময় আপনি নিজেই বিশ্বাস করেন। তখন ব্রেকআপ মানে "একা হয়ে যাওয়া" মনে হয়। অথচ মনোবিদরা বলেন - একা থাকা, বিষাক্ত মানুষের সাথে থাকার থেকে ১০০ গুণ ভালো।

কারণ ৪: পুরোনো ১০% মেমোরির জন্য ৯০% কষ্ট সহ্য

সাব-পয়েন্ট: ব্রেন শুধু ভালো দিনগুলো মনে রাখে বছরে ১০ দিন ঘোরা, সারপ্রাইজ, বার্থডে। ব্রেনের কাজই হল ওই ১০% কে বড় করে দেখানো আর ৯০% কান্নার দিন ভুলিয়ে দেওয়া। তাই ঝগড়ার পরেও মনে হয় "নাহ ও তো ভালোও"। একটা ডায়েরিতে লিখুন - গত ৩০ দিনে কতবার হেসেছেন vs কতবার কেঁদেছেন। হিসাব নিজেই উত্তর দেবে।

কারণ ৫: গ্যাসলাইটিং - "আমিই কি পাগল?"

নিজের বাস্তবতাকেই অবিশ্বাস করা। সবচেয়ে ভয়ংকর কারণ। আপনাকে অপমান করে বলবে "তুমি বেশি ভাবো", "এটা মজা ছিল", "তোমার মেন্টাল প্রবলেম আছে"। আস্তে আস্তে আপনি নিজের চোখ, নিজের কানকেও অবিশ্বাস করেন। মনে হয় "হয়তো আমারই দোষ"। এই কনফিউশনের জন্যই বেরোনোর রাস্তা খুঁজে পান না।

সমাধান কী? ৩টে স্টেপে বেরোনোর রাস্তা ১. নিজেকে দোষী ভাবা বন্ধ করুন: আপনি দুর্বল নন। আপনি একটা সাইকোলজিক্যাল ফাঁদে আছেন। ২. একজনকে সবটা বলুন: বন্ধু, দিদি, কাউন্সেলর। একা যুদ্ধ করবেন না। ট্রমা বন্ড CBT থেরাপিতে কাটে। ৩. নো কন্ট্যাক্ট রুল: ফোন, সোশ্যাল, মিউচুয়াল - ৯০ দিনের জন্য সব বন্ধ। এই ৯০ দিন নিজেকে দিন - জিম, নতুন স্কিল, বন্ধুদের সাথে সময়।

ভালোবাসা মানে শান্তি, কষ্ট নয়:

মনে রাখবেন ভালোবাসা মানে রোজ ঘুম নষ্ট হওয়া নয়। ভালোবাসা মানে নিশ্বাস নিতে পারা। যদি কোনো সম্পর্কে আপনার আত্মসম্মান, ঘুম, হাসি - সব চলে যায়, তাহলে বুঝবেন ওটা ভালোবাসা নয়, ওটা অভ্যাস।

ছাড়তে ১ মাস কষ্ট হবে। কিন্তু এই কষ্টটা আপনাকে মুক্তি দেবে। আর এই সম্পর্কে থাকার কষ্টটা আপনাকে শেষ করে দেবে। পছন্দ আপনার।