বুক ধড়ফড় করা বা হার্টবিট অনিয়মিত হওয়া মানেই সবসময় হার্ট অ্যাটাক নয়। মানসিক চাপ, রক্তাল্পতা বা থাইরয়েডের মতো কারণেও এমন হতে পারে। তবে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বুক ধড়ফড় করলে বা হার্টবিট অনিয়মিত হলে অনেকেই ভয় পেয়ে যান। কেউ কেউ আবার একে সাধারণ টেনশন ভেবে এড়িয়ে যান। আবার কারও কারও মনে হয়, সামান্য অস্বস্তি মানেই বুঝি হার্ট অ্যাটাক! কিন্তু বুক ধড়ফড় করার মানেই যে হার্টের রোগ, এমনটা একেবারেই নয়। তবে হ্যাঁ, কখনও কখনও হার্টের এই ছন্দপতন বড় কোনও বিপদের ইঙ্গিতও হতে পারে। তাই বুক ধড়ফড়ানিকে ভয় না পেয়ে বা এড়িয়ে না গিয়ে, এর পেছনের বিজ্ঞানসম্মত কারণগুলো বোঝা খুব জরুরি।
হার্টবিট আসলে কী?
একটা জটিল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা আমাদের হার্টের কাজ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে। একজন সুস্থ মানুষের হার্ট মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার স্পন্দিত হয়। আর সারাদিনে গড়ে প্রায় এক লাখ বার। স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা এই স্পন্দন টেরই পাই না।
কিন্তু যখন হার্ট অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বা ধীরে স্পন্দিত হয়, কিংবা ছন্দপতন ঘটে, তখন আমরা সেটা বুঝতে পারি। ডাক্তারি ভাষায় একে প্যালপিটেশন (Palpitation) বলে। এটা শুধু বুকেই নয়, গলা বা ঘাড়েও অনুভূত হতে পারে। হার্টের বৈদ্যুতিক সিগন্যালে গন্ডগোল হলে স্পন্দনের এই ছন্দপতন ঘটে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যারিথমিয়া (Arrhythmia) বলা হয়।
হার্টের রোগ ছাড়া আর কী কী কারণে এমন হয়?
- বুক ধড়ফড় করলেই যে হার্টের রোগ আছে, তা নয়। শরীরের আরও অনেক পরিবর্তনও হার্টের ছন্দের ওপর সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে:
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ভয় বা উদ্বেগ।
- কঠোর শারীরিক পরিশ্রম, জ্বর, শরীরে জলের অভাব (ডিহাইড্রেশন)।
- অতিরিক্ত চা, কফি, এনার্জি ড্রিঙ্ক খাওয়া এবং ধূমপান।
- রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) বা থাইরয়েড হরমোনের ওঠানামা।
- রক্তে লবণের (ইলেক্ট্রোলাইটস) ভারসাম্যহীনতা।
- অ্যালার্জি বা হাঁপানির কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
লক্ষণ: কী কী ভাবে এটা বোঝা যায়?
১. একটা স্পন্দন মিস হওয়া - প্রিম্যাচিউর বিটস (Premature beats): অনেকেই বলেন, মনে হয় যেন এক সেকেন্ডের জন্য হার্টটা থেমে গেল। আসলে এখানে হার্টবিট থেমে যায় না। বরং হার্টে সময়ের আগেই একটা অতিরিক্ত স্পন্দন তৈরি হয়, যার ফলে পরের স্পন্দনটা একটু বেশি জোরে অনুভূত হয়। সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষেরও এমন হতে পারে। তবে বারবার এমন হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. হঠাৎ শুরু হওয়া তীব্র বুক ধড়ফড়ানি:
এসভিটি (SVT): কারও কারও ক্ষেত্রে হার্টবিট হঠাৎ করে খুব বেড়ে যায়। এটা কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে এবং তারপর হঠাৎ করেই স্বাভাবিক হয়ে যায়। এর একটা কারণ হতে পারে সুপ্রাভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়া (SVT)-এর মতো ছন্দপতন।
অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন (Atrial fibrillation): এক্ষেত্রে হার্টবিট পুরোপুরি অনিয়মিত হয়ে যায়। বয়স্কদের এবং যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হার্টের ভালভের সমস্যা আছে, তাদের এএফ (AF) হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এএফ-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো স্ট্রোকের ঝুঁকি। কিছু রোগীর হার্টের ওপরের প্রকোষ্ঠে রক্ত জমে জমাট বাঁধতে পারে। সেই রক্ত জমাট বেঁধে মস্তিষ্কে পৌঁছলে স্ট্রোক হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। তাই এএফ ধরা পড়লে চিকিৎসক রোগীর স্ট্রোকের ঝুঁকি বিচার করে প্রয়োজনে রক্ত পাতলা করার ওষুধ দেন।
৩. চোখে অন্ধকার দেখা এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: হার্টবিট খুব বেড়ে বা কমে গেলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল সাময়িকভাবে কমে যায়। তখন রোগী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যেতে পারেন। কোনও পূর্বলক্ষণ ছাড়াই এমনটা হতে পারে বলে এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
বুক ধড়ফড়ানির সঙ্গে নিচের লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান:
- বুকে তীব্র ব্যথা বা ভারী ভাব।
- শ্বাসকষ্ট এবং অতিরিক্ত ঘাম।
- মাথা ঘোরা এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
- বুক ধড়ফড়ানি নিজে থেকে না কমে দীর্ঘক্ষণ ধরে চলতে থাকা।
- যাদের আগে হার্ট অ্যাটাক বা ভালভের রোগ হয়েছে, তাদের নতুন করে বুক ধড়ফড় করা।
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুকে তীব্র ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে "পরে কার্ডিওলজিস্ট দেখাব" বলে বসে না থেকে সরাসরি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাওয়া উচিত।

