Panta Bhat Tips: গরমে পেট ঠান্ডা রাখতে মায়েরা রাতে ভাতে জল ঢেলে রাখতেন। সকালে নুন, কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ দিয়ে মেখে—আহা! বাঙালির সেই পান্তা ভাতই ওড়িশায় গিয়ে হয় ‘পাখালা’, অসমে ‘পইতা ভাত’, ছত্তিশগড়ে ‘বাসি’, বিহারে ‘গেলা ভাত’, তামিলনাড়ুতে ‘পালায়া সাধম’। 

Panta Bhat Tips: জৈষ্ঠের দুপুর। লোডশেডিং, পাখা ঘুরছে না। মা ঠান্ডা পান্তা ভাত বেড়ে দিলেন। সাথে আলু সেদ্ধ মাখা, কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ। এক গ্রাস মুখে দিতেই শরীর জুড়িয়ে গেল। এই সিনটা শুধু বাংলার না। পুরো পূর্ব-দক্ষিণ-মধ্য ভারতের। গরিব-বড়লোক সবাই খায়। কারণ এটা শুধু খাবার না, এটা বিজ্ঞান। রাতভর ভিজে ভাত ফার্মেন্ট হয়ে প্রোবায়োটিক হয়। পেট ঠান্ডা, হজম ভালো, ভিটামিন B12 বাড়ে। পরের দিন সকালে কৃষক-শ্রমিক এই ভাত খেয়েই মাঠে নামত। ফ্রিজ ছিল না, তাই নষ্ট না করার টেকনিক। চলুন দেখি, বর্ডার পেরোলেই এই পান্তা কী নামে, কী রূপে হাজির হয়।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ – পান্তা ভাত, নুন-লঙ্কার প্রেম:

নাম পান্তা। রাতের বেঁচে যাওয়া ভাতে জল ঢেলে রাখা। সকালে জল সমেত ভাত। কেউ ভাতটা নিংড়ে নেয়, কেউ জল সমেত খায়। মাস্ট সাইড ডিশ—আলু সেদ্ধ মাখা, পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, নুন, সরষের তেল। বড়লোক ভার্সন—ইলিশ ভাজা, চিংড়ি ভর্তা, শুকনো লঙ্কা পোড়া। পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ মাস্ট। বাংলাদেশে সাথে শুঁটকি ভর্তা, ডালের বড়া। স্বাদ—হালকা টক, ঝাল, নোনতা। টকটা আসে ফার্মেন্টেশন থেকে। যত বেশি সময় ভিজবে, তত টক। গ্রামে এখনো মাটির হাঁড়িতে রাখে, তাতে স্বাদ দ্বিগুণ।

ওড়িশা – পাখালা, এটা জাতীয় খাবার:

ওড়িশায় এটা শুধু খাবার না, ইমোশন। নাম ‘পাখালা’। ২০ মার্চ ‘পাখালা দিবস’ পালন হয়। দুই টাইপ—১. সাজা পাখালা: ফ্রেশ ভাতে জল ঢেলে সাথে খাওয়া। টক কম। ২. বাসি পাখালা: রাতভর ভেজানো, কড়া টক। সাইড ডিশে ওড়িশা সেরা। বড়ি চুরা, আলু ভর্তা, শাগ ভাজা, মাছ ভাজা, চিংড়ি ছেঁচকি, আম্বুলা—শুকনো আম দিয়ে টক। সাথে দই পাখালাও হয়—জলের বদলে ঘোল বা দই। জগন্নাথ মন্দিরেও মহাপ্রসাদে পাখালা দেওয়া হয় গরমে। লঙ্কা, লেবু পাতা, আদা দিয়ে টেম্পার করে ‘ছুঙ্কা পাখালা’ বানায়। স্বাদ—টক, হালকা ঝাঁঝ, আর দারুণ রিফ্রেশিং।

অসম – পইতা ভাত, সাথে পিটিকা:

অসমে নাম ‘পইতা ভাত’ বা ‘পঁইতা ভাত’। আহোম রাজাদের আমল থেকে চলে আসছে। বোরো ধানের লাল চালের পইতা বেস্ট। ভাতটা একটু মোটা, জলটা ঘোলাটে। মাস্ট সাইড ডিশ ‘আলু পিটিকা’—আলু সেদ্ধ, সরষের তেল, নুন, পেঁয়াজ, ধনেপাতা দিয়ে মাখা। সাথে ‘মাছ পিটিকা’—শুকনো মাছ পুড়িয়ে ভর্তা। ‘কণ ধুনিয়া’ মানে ধনেপাতা বাটা, ‘বেঙেনা পিটিকা’ মানে বেগুন পোড়া মাখা। গরমে বিহু উৎসবের পর সকালে পইতা মাস্ট। স্বাদ—পান্তার মতোই, কিন্তু সরষের তেল আর পিটিকার জন্য ঝাঁঝালো, স্মোকি ফ্লেভার আসে।

ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ড – বাসি ভাত / বাসি বাঁধা

ছত্তিশগড়ের গ্রামে বলে ‘বাসি’। ঝাড়খণ্ডে ‘বাসি বাঁধা’। শ্রমিক, কৃষকদের ব্রেকফাস্ট। মাটির পাত্রে রাখে। সাথে থাকে ‘চেঁচ বেসর’—টমেটো, রসুন, লঙ্কা, সরষে বাটা। আর ‘বিজৌরা’—বিউলির ডালের বড়ি ভাজা। লাল পিঁপড়ের চাটনি ‘চাপড়া’ দিয়েও খায়। এক্সট্রিম প্রোটিন। স্বাদ—তীব্র ঝাল, টক, আর্থি। শহরে ‘বাসি বিলাস’ নামে রেস্টুরেন্টও হয়েছে এখন। মাটির ভাঁড়ে সার্ভ করে।

বিহার – গেলা ভাত, সাথে চোখা:

বিহারে নাম ‘গেলা ভাত’ বা ‘মাড় ভাত’। ‘গেলা’ মানে ভেজানো। গরিবের খাবার, কিন্তু পুষ্টির খনি। সাইড ডিশ—লিট্টি চোখার চোখা। আলু-বেগুন-টমেটো পুড়িয়ে সরষের তেল, নুন, লঙ্কা দিয়ে মাখা। সাথে নুন, পেঁয়াজ, আচার। অনেকে ঘি দিয়েও খায়। মিথিলা অঞ্চলে দই দিয়ে ‘দহি-চূড়া’ স্টাইলে খায়। স্বাদ—চোখার স্মোকি ঝাল আর টক ভাতের কম্বো। মজদুররা টিফিন বক্সে নিয়ে যায়।

তামিলনাড়ু – পালায়া সাধম, দইয়ের ছোঁয়া:

দক্ষিণে যান, নাম বদলে ‘পালায়া সাধম’ বা ‘পাজহায়া সাধম’। তামিলে ‘পালায়া’ মানে বাসি। রাতের ভাতে জল ঢেলে রাখে। সকালে জল ফেলে দিয়ে দই, নুন, কাঁচা লঙ্কা, কারি পাতা, হিং দিয়ে মেখে খায়। অনেকে ছোট পেঁয়াজ, মোর মিলাগাই—দইয়ে ভেজানো শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে খায়। কৃষকদের স্ট্যাপল ব্রেকফাস্ট। ‘নীরাগরম’ নামে আরেকটা ভার্সন আছে—ভাতে জল ঢেলে সাথে সাথে খাওয়া, ফার্মেন্ট হয় না। স্বাদ—দইয়ের জন্য টক-ক্রিমি, হিং-কারি পাতার জন্য সাউথ ইন্ডিয়ান ফ্লেভার।

কেরালা ও অন্ধ্র – পাজহাঙ্কাঞ্জি ও চল্লাদি আন্নাম:

কেরালায় বলে ‘পাজহাঙ্কাঞ্জি’। নারকেল কোরা, ছোট পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, আদা, নুন দিয়ে মাখে। সাথে চাম্মান্থি—নারকেল বাটা, আর চুট্টা মাছ ভাজা। অন্ধ্র-তেলেঙ্গানায় ‘চল্লাদি আন্নাম’ বা ‘চাদ্দান্নাম’। দই, পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, আচার মাস্ট। গরমে ‘উগাদি’ উৎসবের পরদিন খায়। স্বাদ—নারকেলের জন্য মিষ্টি-নোনতা, দইয়ের জন্য টক।

হেলথ বেনিফিট – কেন খাবেন এই গরিবের এসি:

এক, প্রোবায়োটিক: ১২ ঘণ্টা ভিজলে ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। পেটের জন্য দারুণ। দুই, B12 ও আয়রন: ফার্মেন্টেশনে B12, আয়রন, পটাশিয়াম ১০ গুণ বেড়ে যায়। অ্যানিমিয়া কমায়। তিন, বডি কুল্যান্ট: শরীরের তাপমাত্রা কমায়, হিট স্ট্রোক আটকায়। চার, হজম: কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস, অ্যাসিডিটি কমায়। পাঁচ, এনার্জি: কমপ্লেক্স কার্ব, স্লো রিলিজ এনার্জি। সকালে খেলে দুপুর পর্যন্ত খিদে পায় না। ছয়, গ্লুটেন ফ্রি: সিলিয়াক পেশেন্ট খেতে পারে। সাবধান: ২৪ ঘণ্টার বেশি ভিজিয়ে রাখবেন না, ফাঙ্গাস হতে পারে। ডায়রিয়া থাকলে অ্যাভয়েড করুন।

নাম আলাদা, প্রাণ এক। কাঁটাতার, ভাষা, কালচার—সব পেরিয়ে এই জল ঢালা ভাত আমাদের এক সুতোয় বেঁধেছে। পান্তা, পাখালা, পইতা—যে নামেই ডাকুন, গরমে এর চেয়ে শান্তি আর কিছুতে নেই। ফাইভ স্টার হোটেলের দামি ডিশ ফেল। এই সপ্তাহে ট্রাই করুন। কোন রাজ্যের স্টাইল বেস্ট লাগল?

ফার্মেন্টেড খাবারে অ্যালার্জি, IBS, বা কিডনির রোগ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খান। বাসি ভাত ২৪ ঘণ্টার বেশি রাখবেন না।

আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।