দুপুরে রোদে বেরোলেই মাথা ঘোরা, গা গোলানো, লু লাগার ভয়? দাদি-নানিরা বলতেন, ‘পকেটে পেঁয়াজ রাখ, নয়তো ভাতের সাথে কাঁচা পেঁয়াজ খা’। এটা শুধু টোটকা নয়, বিজ্ঞানও বলছে কাঁচা পেঁয়াজ গরমের সুপারফুড। এতে থাকা কোয়ারসেটিন শরীর ঠান্ডা রাখে, ডিহাইড্রেশন আটকায়, হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।

বৈশাখের শেষে জ্যৈষ্ঠের গরম। দুপুর ১২টায় রাস্তায় বেরোলে মনে হয় মাথার উপর আগুন ঢালছে। ঘাম, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, বমি ভাব – লু লাগার লক্ষণ। এই সময় মা-ঠাকুমারা জোর করে পাতে কাঁচা পেঁয়াজ দিতেন। সাথে বিটনুন, পাতিলেবু। বলতেন, ‘পেট ঠান্ডা থাকবে’। আমরা মুখ বেঁকাতাম গন্ধের জন্য। কিন্তু কলকাতা মেডিকেল কলেজের পুষ্টিবিদ ডাঃ অনন্যা সেন বলছেন, “কাঁচা পেঁয়াজ গরমের ব্রহ্মাস্ত্র। এটা ন্যাচারাল কুল্যান্ট। শুধু খাওয়ার নিয়ম জানতে হবে।”

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

গরমে কাঁচা পেঁয়াজ কেন খাবেন? ৫টা বড় গুণ

১. শরীরের AC চালু করে – হিট স্ট্রোক আটকায়

পেঁয়াজে আছে ‘কোয়ারসেটিন’ নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। বাইরে ৪২ ডিগ্রি হলেও শরীর ভিতর থেকে ঠান্ডা থাকে। আয়ুর্বেদ মতে, পেঁয়াজ ‘শীতল’ প্রকৃতির। তাই লু লাগা, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি ৬০% কমে। ব্রিটিশরা ভারতে এসে এই কারণেই পকেটে পেঁয়াজ রাখত।

২. ডিহাইড্রেশন হতে দেয় না

কাঁচা পেঁয়াজে ৮৯% জল। সাথে পটাশিয়াম, সোডিয়াম আছে। ঘাম দিয়ে শরীর থেকে যে নুন-জল বেরিয়ে যায়, পেঁয়াজ সেটা ব্যালেন্স করে। ফলে দুর্বল লাগে না, প্রেশার ফল করে না।

৩. হজম করায়, পেট ঠান্ডা রাখে

গরমে ভাজাভুজি, বিরিয়ানি খেলে পেট গরম হয়, অ্যাসিডিটি হয়। পেঁয়াজে ‘ইনুলিন’ ফাইবার আছে। এটা গুড ব্যাকটেরিয়া বাড়ায়। খাবার তাড়াতাড়ি হজম হয়। পেঁয়াজের সালফার কম্পাউন্ড লিভার পরিষ্কার রাখে। তাই গরমে পেট পরিষ্কার থাকে, মুখে ব্রণ কম ওঠে।

৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

গরম-ঠান্ডায় সর্দি-কাশি, ভাইরাল ফিভার লেগেই থাকে। পেঁয়াজে ভিটামিন C, B6, ফাইটোকেমিক্যাল আছে। এগুলো ন্যাচারাল অ্যান্টিবায়োটিক। ইনফেকশন আটকায়।

৫. রক্ত পাতলা রাখে, হার্ট ভালো রাখে

গরমে রক্ত ঘন হয়ে যায়, স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। পেঁয়াজের সালফার রক্ত পাতলা রাখে, কোলেস্টেরল কমায়। রক্তচাপ কন্ট্রোলে থাকে।

কখন খেলে সবচেয়ে বেশি কাজ হবে? ৩টে গোল্ডেন টাইম:

১. দুপুরের খাবারের সাথে – মাস্ট

দুপুর ১২টা-৩টা সবচেয়ে গরম। এই সময় ভাত-ডাল-মাছের সাথে ১টা মাঝারি কাঁচা পেঁয়াজ কুচি করে বিটনুন, লেবু দিয়ে খান। খাবার হজম হবে, শরীর ঠান্ডা থাকবে, বিকেলে লু লাগবে না। রোদে বেরোনোর ৩০ মিনিট আগে খেলে বেস্ট।

২. সকালে খালি পেটে নয়

খালি পেটে কাঁচা পেঁয়াজ খেলে অ্যাসিডিটি, বুক জ্বালা, বমি হতে পারে। কারণ সালফার গ্যাস তৈরি করে।

৩. রাতে এড়িয়ে চলুন

রাতে পেঁয়াজ খেলে গলা-বুক জ্বালা, ঘুমের সমস্যা, মুখে গন্ধ হয়। আয়ুর্বেদ মতে, রাতে কফ বাড়ায়। তাই সন্ধ্যা ৭টার পর কাঁচা পেঁয়াজ নয়। রান্নায় দিতে পারেন।

কতটা খাবেন? দিনে কটা পেঁয়াজ?

ডাঃ সেন বলছেন, “দিনে ১টা মাঝারি সাইজ বা ৫০-৬০ গ্রাম কাঁচা পেঁয়াজ যথেষ্ট। ২-৩ টুকরো। এর বেশি খেলে পেটে গ্যাস, ডায়রিয়া, মুখে গন্ধ, IBS-এর সমস্যা বাড়বে।”

সেরা উপায় কী? শুধু নুন দিয়ে নয়

১. পেঁয়াজ-পুদিনা-লেবুর স্যালাড: পেঁয়াজ কুচি + পুদিনা পাতা + লেবুর রস + বিটনুন + কাঁচা লঙ্কা। হজম + ঠান্ডা দুটোই হবে।

২. টক দই দিয়ে রায়তা: পেঁয়াজ কুচি টক দইয়ে মিশিয়ে জিরে গুঁড়ো দিন। প্রোবায়োটিক + কুলিং ইফেক্ট।

৩. পান্তা ভাতের সাথে: গরমের সেরা কম্বো। পান্তা ভাত + কাঁচা পেঁয়াজ + কাঁচা লঙ্কা। পেট ঠান্ডা, ঘুম ভালো।

কাদের কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়া বারণ? ৪ ধরনের মানুষ সাবধান:

১. অ্যাসিডিটি/আলসার রোগী: কাঁচা পেঁয়াজ অ্যাসিড বাড়ায়। সমস্যা বাড়বে। ভেজে বা সেদ্ধ করে খান।

২. IBS, গ্যাস্ট্রিকের রোগী: পেঁয়াজে FODMAP থাকে। পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া হবে।

৩. রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেলে: পেঁয়াজ রক্ত আরও পাতলা করে। ওয়ারফারিন খেলে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন।

৪. অপারেশনের আগে: সার্জারির ২ সপ্তাহ আগে কাঁচা পেঁয়াজ বন্ধ। রক্তপাত বেশি হতে পারে।

মুখে গন্ধ হলে কী করবেন? ৩টে টোটকা:

১. খাওয়ার পর ১টা এলাচ বা লবঙ্গ চিবোন।

২. পার্সলে পাতা বা পুদিনা পাতা চিবোন।

৩. লেবুর খোসা দাঁতে ঘষুন।

শেষ কথা:

পেঁয়াজ কাটলে চোখ জ্বলে, খেলে মুখে গন্ধ – এই দুটো কারণে আমরা এড়িয়ে যাই। কিন্তু গরমে এই ‘চোখের জল’ই আপনাকে হসপিটালে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাবে।

তাই আজ দুপুরে ভাতের পাতে এক ফালি কাঁচা পেঁয়াজ রাখুন। বিটনুন-লেবু দিন। নিয়ম মেনে খান, তফাৎ নিজেই বুঝবেন।

মনে রাখবেন, প্রকৃতি বিনা কারণে কিছু দেয় না। গরমের দেশে গরমেই পেঁয়াজ ওঠে। কারণ এটাই গরমের ওষুধ।